বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে এক নারী কর্মী ও তার দুই মেয়ের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনও তথ্য দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যে দুটি কক্ষে লাশ পাওয়া গেছে, সেগুলোর উভয় দরজাই ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।
ঘটনার বিবরণ
বুধবার (৩ জুন) বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শহরের থানাপাড়া এলাকার জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। মৃত নারীর নাম ইতি রানী (৩৪)। তিনি জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর অস্থায়ী কর্মচারী ছিলেন (পরিচ্ছন্নতাকর্মী)। ইতি পৌর শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কালীবাড়ি সড়কের দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী। তার দুই মেয়ের নাম আরাধা বিশ্বাস (১২) ও অনুরাধা বিশ্বাস (৩)।
প্রাথমিক তদন্ত
স্বজন ও ডাকবাংলোর কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতি রানী জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে পার্টটাইম ঝাড়ুদার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো বুধবার সকালেও কাজে আসেন। তবে এদিন প্রথমবারের মতো সঙ্গে নিয়ে আসেন তার দুই মেয়েকে। পরে ডাকবাংলোর বিভিন্ন কক্ষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে দীর্ঘ সময় কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে অন্যান্য কর্মচারী খোঁজ নিতে যান। তারা তৃতীয় তলার ৩ নম্বর কক্ষে বড় মেয়ে আরাধা বিশ্বাসের লাশ দেখতে পান। পাশের ৪ নম্বর কক্ষটি ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় বিষয়টি জেলা পরিষদের প্রশাসককে জানানো হয়। পরে পরিষদের প্রশাসক ও পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে দরজা ভেঙে ইতি রানী ও তার ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসের লাশ উদ্ধার করে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ৩ নম্বর কক্ষে বড় মেয়ের লাশ বিছানার ওপর পড়ে ছিল। অপরদিকে ৪ নম্বর কক্ষ থেকে মা ও ছোট মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি ঘুমের ওষুধের খালি পাতা জব্দ করেছে পুলিশ। এ ছাড়া ডাকবাংলোর সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়কের বক্তব্য
ডাকবাংলোর তত্ত্বাবধায়ক মো. লিটন জানান, ইতি রানী বেলা ১১টার দিকে ডাকবাংলোতে কাজে আসেন। সঙ্গে তার দুই মেয়ে ছিল। তাকে পরিচ্ছন্নতার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে তিনি জেলা পরিষদ কার্যালয়ে যান। বিকাল ৩টার দিকে ফিরে এসে দেখেন ইতি রানী ডাকবাংলোতে নেই। পরে খোঁজ করতে গিয়ে তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ ভেতর থেকে আটকা দেখে ডাকাডাকি শুরু করেন। কিন্তু কোনও সাড়া না পেয়ে বিষয়টি জেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের জানান। এরপর পুলিশে খবর দেওয়া হয়। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে পুলিশ এসে তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে তিন জনের লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। ইতি রানী দুই মাস আগে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ নেন। আজ প্রথম দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসেন।
পুলিশের ধারণা
পুলিশ জানায়, খাকদোন-৪ নম্বর কক্ষে দরজা বন্ধ অবস্থায় ইতি রানী ও তার ছোট মেয়ে অনুরাধা বিশ্বাসকে পৃথক দুটি খাটে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। একই ভবনের খাকদোন-৩ নম্বর কক্ষ থেকে বড় মেয়ে আরাধার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
ঘটনাস্থলে ঘুমের ওষুধ ও পানির বোতল পাওয়া যায়। বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা বলেন, 'যে কক্ষে ওই নারীর বড় মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে, সেখানে লাশের পাশে ঘুমের ওষুধ ও একটি পানির বোতল পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারী পূর্বপরিকল্পিতভাবে দুই মেয়েকে নিয়ে ডাকবাংলোয় এসেছিলেন। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনও কারণে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন। কারণ, দুটি কক্ষের দরজাই ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।' পুলিশ সুপার আরও বলেন, 'স্বাভাবিকভাবে একজন মা সন্তানদের নিয়ে এ ধরনের স্থানে আসেন না। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আমরা জেনেছি, তিনি মেয়েদের ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। ফলে ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও সুরতহাল রিপোর্ট পর্যালোচনার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুলিশ বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করছে। এ ঘটনায় অন্য কোনও কারণ বা উদ্দেশ্য রয়েছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।'
স্বজনদের আহাজারি
ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস বিষয়টি শোনার পর ডাকবাংলোতে আসেন। এসে তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়ের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন। তিনি সুপারি বেচাকেনার ব্যবসা করেন। ঘটনাস্থলে এসে বলেন, 'আমি সকালে আমতলীতে সুপারি কিনতে যাই। এ সময় স্ত্রীর হাতে বাজারের টাকা দিয়ে যাই। ইতি জানিয়েছিল আজ সে কাজে যাবে না। দুপুরে আমি ফিরে এসে দেখি বাড়িতে তালা দেওয়া। আশপাশে তার (ইতি) ও বাচ্চাদের খোঁজ পাচ্ছিলাম না। পরে ডাকবাংলাতে তাদের লাশ পাওয়ার খবর পাই।'
ইতি রানীর স্বজন শোভা রানী বলেন, 'সকালে ওকে দেখেছি, কথা বলেছি। তখনও বুঝতে পারিনি এটাই শেষ দেখা হবে। ইতি অভাব-অনটনের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিল। কিন্তু নিজের দুই মেয়েকে খুব ভালোবাসতো। ওদের ছাড়া কোথাও যেতো না। এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না, তিন জনই আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।'
আরেক স্বজন বলেন, 'আরাধা খুব শান্ত স্বভাবের মেয়ে ছিল। লেখাপড়ায় ভালো ছিল। অনুরাধা সারাক্ষণ হাসিখুশি থাকতো। ওদের মুখগুলো বারবার চোখের সামনে ভাসছে। এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।'
তাদের আরেক আত্মীয় বলেন, 'আমরা এখনও জানি না ঠিক কী ঘটেছে। শুধু এটুকু জানি, একটি পরিবারের তিনটি প্রাণ একসঙ্গে নিভে গেছে। এই শোক কাটবে না। তাদের এমন পরিণতি দেখে হৃদয় ভেঙে গেছে।'
তদন্ত চলছে
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পৌঁছে তদন্ত শুরু করেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা, পুলিশ সুপার মো. কুদরত-ই-খুদা এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তবে এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।



