শপথের ১০২ দিনেই পদত্যাগ দীপেন দেওয়ানের, নানা বিশ্লেষণ
শপথের ১০২ দিনেই পদত্যাগ দীপেন দেওয়ানের

শপথের ১০২ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। শারীরিক ও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদ ছাড়লেও ভেতরের খবর কী, এ নিয়ে নানা কানাঘুষা চলছে। বিষয়টিকে অনেকে অনেকভাবে বিশ্লেষণ করছেন। এই সময়ে তার সরে যাওয়াকে মেনে নিতে পারছেন না রাঙ্গামাটির স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও তার অনুসারীরা। সোমবার (১ জুন) পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই জেলা সদরে বিক্ষোভ ও সড়ক অবস্থান করেছেন তারা।

পদত্যাগের কারণ নিয়ে নানা জল্পনা

শারীরিক অসুস্থতা, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব, নাকি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে মন্ত্রীর এ সিদ্ধান্ত— এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে মন্ত্রণালয় পরিচালনা, পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন ও রাঙ্গামাটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এর নেপথ্যে কারণ থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিষয়টি কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এই সময়ে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে একজন পূর্ণমন্ত্রীর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক। তিনি পদত্যাগ করলেন আর প্রধানমন্ত্রী তা সঙ্গে সঙ্গেই গ্রহণ করলেন। এটা অনেকে বিশ্বাস করছেন না। ইতোমধ্যে শোনা যাচ্ছে, একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে তার দ্বন্দ্বের কারণে বিষয়টি এতদূর গড়িয়েছে। আশা করি, নিশ্চয়ই এর প্রকৃত কারণ বের হবে।”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পদত্যাগপত্রে কী বলেছেন দীপেন

সোমবার (১ জুন) ঈদের ছুটির প্রথম কার্যদিবসে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পদত্যাগপত্র দেন দীপেন দেওয়ান। তিনি লেখেন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছেন। এ কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনে তার নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বাড়াতে তার বর্তমান পদ (মন্ত্রী) থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব কি আসল কারণ?

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, প্রশাসনিক ও ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান ও প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে বেশ কিছু দিন ধরেই মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চলছিল। এর মধ্যে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ চট্টগ্রাম-৫ আসনের এমপি ও প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালকে মেনে নিতে পারছিলেন না। কারণ অতীতে পাহাড়িদের মধ্য থেকেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগ হতো। তাই মীর হেলালের প্রতি তাদের অসন্তোষ ছিল।

এছাড়া ভূমি সংক্রান্ত স্পর্শকাতর বিষয়সহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রতিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মন্ত্রী দীপেনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছিল। এছাড়া পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর পুনর্গঠন ও রাঙ্গামাটির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ চরমে পৌঁছায়।

যদিও একটি গণমাধ্যমে এ বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, “দীপেন চাচার সঙ্গে আমার কোনও দূরত্ব নেই। আমাদের দুজনের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। আমার আব্বা (সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন) যখন জুডিশিয়ারিতে ছিলেন, তখন তিনি তার সহকর্মী ছিলেন।”

বিএনপি নেতা মনীষ দেওয়ানের প্রতিক্রিয়া

এ নিয়ে মঙ্গলবার (২ জুন) ফেসবুক পোস্টে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির উপজাতিবিষয়ক সহ-সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ান ফেসবুক পোস্টে এক ধরনের ইঙ্গিত দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, “এ মুহূর্তে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সত্য কথনের জরুরি দরকার। দীপেন দেওয়ান তার মন্ত্রীত্ব হারিয়েছেন শুধুমাত্র একটি কারণে। তিনি আসন্ন রাঙ্গামাটি জেলার চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও একাত্তরে শহীদ জিয়ার সহযোদ্ধা লে. কর্নেল মনীষ দেওয়ানকে। পক্ষান্তরে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল চেয়েছিলেন দীপেন তালুকদার দিপুকে। যিনি জুলাই বিপ্লবে ৬ মাস রাঙ্গামাটি থেকে গা ঢাকা দিয়ে পলাতক ছিলেন (স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবগত ছিলেন) এবং ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধরনের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও কুখ্যাত আওয়ামী নেতাদের প্রশ্রয় দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন। যা রাঙ্গামাটিবাসী সবাই অবগত আছেন।”

তিনি আরও লিখেছেন, “খুবই দুঃখজনক এই যে, সুপারিশের এই যুদ্ধে আমাদের পূর্ণমন্ত্রী পাহাড়ি বাঙ্গালির প্রাণ প্রিয় নেতা, সর্বোচ্চ ভোট দিয়ে আমরা যাকে নির্বাচিত করেছি, তিনি হেরে গেছেন! শুধু তাই নয়, তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়েছে। আমি এ বিচারের ভার দেশপ্রেমিক পার্বত্যবাসী ও দেশবাসীর উদ্দেশে নিবেদন করলাম।”

রাঙ্গামাটিতে অসন্তোষ

দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের খবরে সোমবার (১ জুন) বিকালে রাঙ্গামাটি শহরের গর্জনতলী এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন দলীয় নেতাকর্মীরা। এসময় সড়ক অবরোধ করে স্লোগান দেন। এতে দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে জেলার শীর্ষ নেতারা এসে রাস্তা থেকে কর্মীদের তুলে দেন। এতে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

রাজনীতিবিদদের মন্তব্য

জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “দীপেন দেওয়ান হঠাৎ কী কারণে পদত্যাগ করলেন, তা বলা কঠিন। সেটি তাকেই ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। তবে যতটুকু শুনেছি— সেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বাইরে একজনকে প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যা নিয়ে সেখানের মানুষদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ ছিল। আমি মনে করি, সরকারের উচিত তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। আমার দৃষ্টিতে পাহাড়ি জনপদের জন্য দীপেন দেওয়ানের দায়িত্বে থাকা জরুরি।”

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সংসদীয় দলের হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “এই সময়ে সরকারের একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ রহস্যজনক। এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেই ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।”