যখন কোনো নৃশংস অপরাধ ঘটে, তখন দেশজুড়ে মানুষের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, ঘৃণা ও প্রতিশোধস্পৃহা তীব্র আকার ধারণ করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে জনপরিসর—সবখানেই তখন দাবি উচ্চারিত হয়: ‘দ্রুত বিচার চাই’, ‘অপরাধীকে প্রকাশ্যে শাস্তি দিতে হবে’, ‘আইনের দীর্ঘসূত্রিতা আর নয়’। কেউ বলেন প্রকাশ্যে ফাঁসি দিতে হবে, কেউ চান পাথর ছুড়ে মৃত্যুদণ্ড, আবার কেউ দাবি করেন জনগণকেই অস্ত্র দিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।
আবেগ বনাম যুক্তি
বর্তমান বাস্তবতায় এই আবেগকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ অপরাধ যখন নির্মম হয়, তখন মানুষের বিবেকও স্বাভাবিকভাবেই প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত হয়। তাই একটি শিশুর ধর্ষণ, হত্যা কিংবা ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা কেবল একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষের মনে এ ধারণার জন্ম নিয়েছে —রাষ্ট্র ব্যর্থ, বিচার ব্যবস্থা অকার্যকর, আইন যেন কেবল বিলম্বের আরেক নাম। কিন্তু এখানেই আমাদের থামতে হবে এবং নিজেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি কেবল ক্ষুব্ধ জনতা হতে চাই, নাকি একটি সভ্য রাষ্ট্রের নাগরিক হতে চাই?
রাষ্ট্র ও সামাজিক চুক্তি
রাষ্ট্র আসলে একটি সামাজিক চুক্তির নাম। মানুষ ব্যক্তিগত প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে এই বিশ্বাসে যে, রাষ্ট্র নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করবে। বিনিময়ে নাগরিকরা আইন মেনে চলবে। যদি সেই কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং প্রতিটি মানুষ নিজেই বিচারক, জল্লাদ ও শাস্তিদাতা হয়ে ওঠে, তাহলে সভ্যতা আর অরাজকতার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না।
ইতিহাসের শিক্ষা
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রকাশ্যে নৃশংস শাস্তি সমাজকে সভ্য করেনি; বরং মানুষের মনস্তত্ত্বকে সহিংসতার প্রতি অভ্যস্ত করে তুলেছে। একসময় ইউরোপে গিলোটিনের মাধ্যমে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো, রোমান সাম্রাজ্যে কলোসিয়ামে মানুষ হত্যাকে বিনোদন বানানো হয়েছিল, জলদস্যুদের লাশ ঝুলিয়ে রাখা হতো জনসমক্ষে। কিন্তু এসব নিষ্ঠুরতা অপরাধ নির্মূল করতে পারেনি। বরং সমাজ ধীরে ধীরে রক্তপাতকে স্বাভাবিকভাবে নিতে শিখেছে। ন্যায়বিচারের জায়গা দখল করেছে প্রতিশোধের উন্মাদনা।
প্রমাণভিত্তিক বিচার
সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—সেখানে বিচার হয় প্রমাণের ভিত্তিতে, আবেগের ভিত্তিতে নয়। “Justice hurried is justice buried”—অর্থাৎ তাড়াহুড়ো করে দেওয়া বিচার অনেক সময় প্রকৃত বিচারকে ধ্বংস করে দেয়। বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ংকর হলো ভুল বিচার। হাজার অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাক—তবুও একজন নিরপরাধ মানুষের অন্যায় শাস্তি কোনো সভ্য রাষ্ট্র মেনে নিতে পারে না।
আমাদের সমাজে এমন উদাহরণও আছে যেখানে প্রথমে যাকে অপরাধী মনে করা হয়েছিল, তদন্ত শেষে দেখা গেছে প্রকৃত অপরাধী অন্য কেউ। আবেগের মুহূর্তে জনতার রায় অনেক সময় সত্যকে আড়াল করে দেয়। তাই সাক্ষ্য, প্রমাণ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ডিএনএ টেস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ—সবকিছুর গুরুত্ব অপরিসীম। এমনকি ইসলামী শরিয়াহ আইনেও শাস্তির ক্ষেত্রে সাক্ষ্য-প্রমাণের কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। ১৪০০ বছর আগে যখন প্রযুক্তি ছিল না, তখনও প্রমাণ ছাড়া শাস্তির অনুমতি দেওয়া হয়নি; আজকের যুগে আধুনিক প্রযুক্তি সেই বিচার প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল করার সুযোগ এনে দিয়েছে।
ভিজিল্যান্টিজমের বিপদ
আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো ভিজিল্যান্টিজম—অর্থাৎ জনগণের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। যখন মানুষ রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, তখনই ভিজিল্যান্ট গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। কিন্তু এটি কখনোই সমাধান নয়; বরং এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার দুর্বলতার লক্ষণ। কারণ প্রতিশোধের নেশায় পরিচালিত জনতা খুব দ্রুতই ন্যায়বিচারের সীমা অতিক্রম করে বিশৃঙ্খলার দিকে চলে যায়। আজ যে জনতা অপরাধীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে, কাল সেই অস্ত্রই অন্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে ব্যক্তিগত বিদ্বেষে বা ভুল সন্দেহে।
আইনজীবীদের ভূমিকা
একইভাবে আইনজীবীদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো জঘন্য অপরাধের ঘটনায় আইনজীবীদের মানবিক প্রতিক্রিয়া থাকতেই পারে। কিন্তু আইনের শাসনের মূল নীতিই হলো—যথাযথ প্রক্রিয়ায় অপরাধ প্রমাণের আগ পর্যন্ত কেউ অপরাধী নয়। একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার রাখে। কারণ বিচার ব্যবস্থার শক্তি এখানেই যে, এটি ঘৃণিততম ব্যক্তিকেও ন্যায্য প্রতিরক্ষার সুযোগ দেয়। অন্যথায় বিচার আর প্রতিশোধের মধ্যে পার্থক্য থাকে না।
উপসংহার
আজ সমাজ উত্তাল। মানুষের ক্ষোভ বাস্তব, বেদনা সত্য। কিন্তু এই আবেগের মুহূর্তেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম ও আইনের শাসনের প্রতি অটল বিশ্বাস। আমরা যদি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সভ্য রাষ্ট্র গড়তে চাই, তাহলে বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস নয়, বরং শক্তিশালী করতে হবে। বিচার হতে হবে দ্রুত, কিন্তু নিরপেক্ষ; কঠোর, কিন্তু প্রমাণভিত্তিক; মানবিক, কিন্তু আপসহীন। কারণ প্রতিশোধ হয়তো সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু কেবল ন্যায়বিচারই একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে।
লেখক: ইসলামী অর্থনীতিবিদ, সমাজ চিন্তক ও মানবাধিকার কর্মী



