সংশোধিত তামাক আইনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বিলুপ্ত করায় তামাক কোম্পানিগুলো দেশের তরুণ প্রজন্মকে নেশার জালে জড়াতে আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। রোববার (২৪ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়।
তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ২০২৫’ জারি করে দেশে ই-সিগারেট ও ক্ষতিকর তামাক পণ্য নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি বিক্রয়স্থলে তামাক পণ্যের প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছিল; কিন্তু এ বছর সংশোধিত আইন থেকে এই দুটো অতি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তামাক কোম্পানিগুলো দেশের তরুণ প্রজন্মকে নেশার জালে জড়াতে আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
এ বছরের বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত প্রতিপাদ্য হলো- প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ‘মানস’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত শব্দসৈনিক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সহ-সভাপতি রুমানা রশীদ ঈশিতা, সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মতিউর রহমান তালুকদার এবং ইউনিকো হাসপাতালের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার আরদ্রা কুরিয়েন।
তামাকের বৈশ্বিক প্রভাব
অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধে বলেন, তামাক হচ্ছে বিশ্বের এক নীরব মহামারী এবং এটি সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৮৭ লাখের বেশি মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায়, যার মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। বাংলাদেশে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
‘টোব্যাকো এটলাস-২০২৫’ এর তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে ১ লাখ ৯৯ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং এর চিকিৎসায় বছরে রাষ্ট্রের ব্যয় হয় প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল আর্থিক ও মানবসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি প্রকৃতপক্ষে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা যায়।
ই-সিগারেটের ক্ষতিকর প্রভাব
বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসক আরও বলেন, ই-সিগারেট বা ভেপিং তুলনামূলক নিরাপদ বলে তামাক কোম্পানিগুলো যে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে এটি নিকোটিন আসক্তির এক আধুনিক রূপ যা বর্তমানে দেশের গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। আকর্ষণীয় ডিজাইন, বিভিন্ন ফ্লেভার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে ‘ফ্যাশন’ হিসেবে উপস্থাপনের কারণে তরুণ ও উঠতি বয়সিরা এতে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ক্ষতিকর, যা ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিশ্বের অন্তত ৪৭টি দেশ ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশেও তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় অবিলম্বে নতুন আইন করে ই-সিগারেট ও সব ধরনের ইমার্জিং তামাক পণ্য নিষিদ্ধ করা জরুরি।
বিনোদন মাধ্যমে তামাকের গ্ল্যামারাইজেশন
সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিনোদন মাধ্যমে ধূমপান ও মাদকের ‘গ্ল্যামারাইজেশন’ বা আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের তীব্র সমালোচনা করে ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তিপ্রাপ্ত ৫টি শীর্ষ চলচ্চিত্রের ওপর পরিচালিত একটি পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা জানান, চলচ্চিত্রগুলোতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন দেখা গেছে। যেমন, 'রাক্ষস' চলচ্চিত্রে আইন লঙ্ঘন করে ১৯২ বার ধূমপানের দৃশ্য সরাসরি ফোকাস করে দেখানো হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেট প্রদর্শন করা হয়েছে। ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র 'প্রিন্স'-এ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ১৬৫ বার ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবনের দৃশ্য দেখানো হয়েছে, যার মধ্যে অভিনেতা শাকিব খান নিজেই ৪৪ বার ধূমপান করেছেন। এমনকি একজন নারী চরিত্রকে দিয়ে থানা হাজতের ভেতর টানা ১ মিনিট ধরে ধূমপানের দৃশ্য অত্যন্ত ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে, যা সমাজ ও সংস্কৃতির পরিপন্থি।
একইভাবে 'বনলতা এক্সপ্রেস' চলচ্চিত্রে ২ ঘণ্টা ৩৩ মিনিটের মধ্যে ৬৪ বার ধূমপানের দৃশ্য রয়েছে, যেখানে ট্রেনের কামরা ও পাবলিক প্লেসের মতো নিষিদ্ধ স্থানে জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম ও শরীফুল রাজকে অনবরত ধূমপান ও মদ্যপান করতে দেখা গেছে। 'দম' চলচ্চিত্রে ধূমপানের দৃশ্য তুলনামূলক কম হলেও, অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর মাধ্যমে সরাসরি হাকিম জর্দার নাম সংলাপে এবং হাতে ক্যামেল ব্র্যান্ডের সিগারেটের প্যাকেট ফোকাস করে পরোক্ষ বিজ্ঞাপন চালানো হয়েছে। এছাড়া 'প্রেসারকুকার' চলচ্চিত্রে ৬০ বার ধূমপানের দৃশ্য রয়েছে, যেখানে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় পুলিশ কর্মকর্তা এবং নারী চরিত্রকে দিয়ে থানায় বসে ধূমপান ও ই-সিগারেট সেবন করানো হয়েছে। এই ধরণের দৃশ্য ধারণ কিশোর-তরুণদের ব্যাপকভাবে বিপদগ্রস্ত করছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা তামাকের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও পারিবারিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশের ১৫ বছরের কম বয়সি প্রায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার শিশু তামাকজনিত রোগে ভুগছে, যার মধ্যে ৬১ হাজারের বেশি শিশু নিজ বাড়িতেই পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে। ধূমপানের কারণে পরিবারে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার বাজেট কাটছাঁট করতে হয়, যা দারিদ্র্যকে আরও প্রকট করে তোলে। অথচ একজন ধূমপায়ী তার প্রতিদিনের সিগারেটের খরচ বাঁচিয়ে পরিবারের জন্য পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারেন। তামাক চাষের ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করে বলা হয়, তামাক চাষ কেবল কোম্পানির জন্য লাভজনক, কৃষকের জন্য নয়। সম্প্রতি মেহেরপুরে তামাক চাষীদের হাহাকার ও দুধ দিয়ে গোসল করে তামাক চাষ বর্জনের ঘটনা আমাদের সেই বার্তাই দেয়।
বাংলাদেশ যখন ‘ইয়ুথ ডিভিডেন্ট’ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুফল পেতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই তরুণ ও যুবশক্তিকে ধ্বংস করতে তামাক কোম্পানিগুলো ফাঁদ পেতেছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
প্রস্তাবিত পদক্ষেপ
বক্তারা বলেন, আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তামাক পণ্যের সব ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা ও স্পন্সরশিপ কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। নাটক, চলচ্চিত্র, ওয়েবসিরিজ ও ডিজিটাল কনটেন্টে ধূমপান এবং তামাকের দৃশ্য প্রদর্শন শতভাগ নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। একই সাথে নীতিমালা বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশে ই-সিগারেট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক পণ্য বিক্রয় সম্পূর্ণ বন্ধ করা জরুরি।
তারা বলেন, মহামান্য হাইকোর্টের আপিল বিভাগের সিভিল আপিল (নং ২০৪-২০৫/২০০১) মামলার রায়ে দেশের নতুন কোনো তামাক কোম্পানিকে লাইসেন্স না দেওয়া এবং বিদ্যমান কোম্পানিগুলোকে বিকল্প পণ্য উৎপাদনে বাধ্য করার যে নির্দেশনা রয়েছে, সরকারকে তা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। তামাকের বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেকে ও প্রিয়জনদের রক্ষা করতে এবং একটি সুস্থ ও তামাকমুক্ত সমাজ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান বক্তারা।



