বুয়েটের তিন শিক্ষার্থীর ‘জাইগো’ অ্যাপ: রাইড শেয়ারিংয়ে নতুন দিগন্ত
বুয়েটের তিন শিক্ষার্থীর ‘জাইগো’ অ্যাপ: রাইড শেয়ারিংয়ে নতুন দিগন্ত

ঢাকার যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আজাদুল ইসলাম (ছদ্মনাম) প্রতিদিন কারওয়ান বাজারে অফিস করেন। যাত্রাবাড়ী থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বাস, সিএনজি বা রিকশায় আসেন, তারপর মেট্রোরেলে যান কারওয়ান বাজারে। ফেরার পথেও একই পথ। বাসে ভিড় ও পকেটমারের ঝুঁকি, সিএনজিতে ‘গলাকাটা’ ভাড়া, আর রিকশাও এখন সস্তা নয়। তাই প্রায়ই তাঁর মনে হয়, যদি রাইড শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অন্য যাত্রীর সাথে ভাড়া ভাগ করে নেওয়া যেত, তাহলে খরচ কমত।

আজাদুলের এই ভাবনা শুধু তাঁর একার নয়। ঢাকায় একই সময়ে একই গন্তব্যে অনেকেই যান, কিন্তু অধিকাংশই একা যান, ফলে বাকি আসন ফাঁকা থাকে এবং ভাড়ার পুরো বোঝা একজনের ওপর পড়ে।

এই সমস্যার ‘স্মার্ট’ সমাধান এনেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের তিন শিক্ষার্থী – জোবায়ের খান, মুস্তাকিম মোরসেদ ও আবুল বাসার। তাঁরা তৈরি করেছেন ‘জাইগো’ (JyGo) নামের একটি ‘ভেহিকেল-পুলিং’ অ্যাপ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অ্যাপের ধারণা ও কার্যপ্রণালী

তিন উদ্যোক্তা জানান, অ্যাপটির ধারণা খুবই সহজ। একই সময়ে, একই পথে বা গন্তব্যে যেতে চান, এমন যাত্রীদের এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে অ্যাপটি। তারপর তাঁরা একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি বা রিকশায় ভাগাভাগি করে গন্তব্যে যেতে পারেন, ফলে ভাড়া ভাগ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, কারওয়ান বাজার থেকে যাত্রাবাড়ী যেতে সিএনজির ভাড়া ৪০০ টাকা। জাইগো অ্যাপের মাধ্যমে তিন যাত্রী একত্র হয়ে গেলে প্রতিজনের খরচ ১৩৩ টাকায় নেমে আসে।

খরচ কমানোর দাবি

উদ্যোক্তাদের দাবি, অ্যাপটি ব্যবহার করে খরচ ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। তাঁরা যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো কমিশন নিচ্ছেন না। সহ-উদ্যোক্তা জোবায়ের খান বলেন, ‘এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু খরচ কমানো নয়, ঢাকার যানজট কমাতেও ভূমিকা রাখা। কম যানবাহনে বেশি যাত্রী পরিবহন করলে জ্বালানি খরচও কমবে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রাথমিক সাফল্য ও সম্প্রসারণ পরিকল্পনা

চলতি বছরের জানুয়ারিতে গুগল প্লে স্টোর ও হুয়াওয়ের অ্যাপ গ্যালারিতে চালু হওয়ার পর মাত্র তিন মাসে অ্যাপটির ব্যবহারকারী সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি বৈশ্বিক স্টার্টআপ নেটওয়ার্ক ‘এফ৬এস’-এর শীর্ষ রাইড হেইলিং কোম্পানির তালিকায় চার নম্বরে স্থান পেয়েছে জাইগো।

সেবাটি বর্তমানে ঢাকাকেন্দ্রিক। আগামী মাসে মালয়েশিয়ায় কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে, পর্যায়ক্রমে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় বিস্তৃত করার চিন্তা।

সেবা পাওয়ার উপায়

অ্যাপটি ব্যবহার করতে গুগল প্লে স্টোর বা হুয়াওয়ের অ্যাপ গ্যালারি থেকে ডাউনলোড করে নাম ও ফোন নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। অ্যাপে দুই ধরনের রাইড শেয়ারিং অপশন রয়েছে – নিয়মিত রুট (যেখানে ব্যবহারকারী দৈনন্দিন পথ নির্ধারণ করে রাখতে পারেন) এবং তাৎক্ষণিক রুট (যেখানে লাইভ লোকেশন ব্যবহার করে কাছাকাছি যাত্রীদের সংযোগ করা হয়)।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা

অপরিচিত মানুষের সাথে যাত্রা ভাগাভাগির নিরাপত্তা নিশ্চিতে অ্যাপে রয়েছে ব্যবহারকারী যাচাইকরণ, লাইভ লোকেশন ট্র্যাকিং ও জরুরি কল। নারী যাত্রীদের জন্য ‘জেন্ডার প্রেফারেন্স’ অপশন রাখা হয়েছে, যাতে তারা শুধু নারী সহযাত্রীদের সাথে যাত্রা করতে পারেন।

বিশেষজ্ঞ মতামত ও সীমাবদ্ধতা

বুয়েটের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম বলেন, ‘ঢাকায় এ ধরনের উদ্যোগ তুলনামূলক নতুন। একই এলাকার যাত্রীদের এক যানবাহনে সংযুক্ত করার এই মডেল সৃজনশীল ভাবনার প্রতিফলন। তবে নিরাপত্তার বিষয়ে আরও কাজ করা দরকার।’

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখনো কম, ফলে নির্দিষ্ট রুটে সহযাত্রী পেতে সময় লাগে। উদ্যোক্তারা জানান, ব্যবহারকারী বাড়লে অপেক্ষার সময় কমবে।

প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।