সীমিত বাজেটে বড় স্বপ্ন: ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের চ্যালেঞ্জ
সীমিত বাজেটে বড় স্বপ্ন: ঢাকার বাইরের ক্লাবের চ্যালেঞ্জ

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা বিভিন্ন ক্লাব বা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ প্রবাদটির সঙ্গে তাঁরা নিশ্চিতভাবেই পরিচিত। দিনরাত ক্যাম্পাসে পড়ে থাকা, খেয়ে না খেয়ে প্রোগ্রাম নামানো, অনুষ্ঠান শেষে শরীরভরা ক্লান্তি আর বুকভরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাড়ি ফেরা—এটিই তো স্বাভাবিক! তবে বাস্তবতা কখনো কখনো বেশ জটিল, বিশেষ করে ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে। ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক আয়োজন করা হয়ে ওঠে না। দুর্দান্ত সব আইডিয়াও মুখ থুবড়ে পড়ে কেবল পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে।

ঢাকার বাইরের ক্লাবগুলোর বড় পরীক্ষা

ঢাকার বাইরের ক্লাবগুলোর কাছে বড় আয়োজন মানে বড় পরীক্ষা। কারণ, পৃষ্ঠপোষক বা স্পনসর পাওয়া বেশ কঠিন। খরচ কমানো, অনুষ্ঠানের কলেবর ছোট করা, নিজেরাই টাকা তুলে বাজেটের কিছু অংশ জোগান দেওয়া—এগুলো বেশ স্বাভাবিক ঘটনা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এডুকেশন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জেবা আনিকা চৌধুরী শোনাচ্ছিলেন তাঁদের অভিজ্ঞতা, ‘আমরা অনেক সময় আইডিয়া নিয়ে বসি, তার পরই হিসাব শুরু করি। আসলে আমাদের জন্য আইডিয়া বাস্তবায়নের আগে সবচেয়ে বড় ধাপ হলো ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট। অনেক ভালো আইডিয়াও শুধু বাজেটের কারণে ছোট করে ফেলতে হয়।’

এই বাস্তবতা একক কোনো ক্লাবের নয়। খুলনা, বরিশাল, কুমিল্লা, যশোর, দিনাজপুর বা রংপুর—সবখানেই ক্লাবগুলোকে নিজেদের পরিকল্পনা সীমিত সম্পদের মধ্যে গুছিয়ে নিতে হয়। অনেক সময় একাধিক প্রোগ্রাম একসঙ্গে না করে আলাদাভাবে করতে হয়। কখনো অতিথির সংখ্যা কমাতে হয়, কখনো আবার পুরো আয়োজনই ছোট পরিসরে নিয়ে আসতে হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বপ্ন থেমে থাকে না

কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁদের স্বপ্ন থেমে থাকে না। জেবা যেমন বললেন, ‘আমরা গত বছর প্রথমবারের মতো একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্মেলন করেছি। যেকোনো ক্লাবের জন্যই আন্তর্জাতিক মানের ইভেন্ট নামানো অনেক কঠিন। স্পনসর না পেলে সেটি আরও কঠিন হয়ে যায়। ঢাকার বাইরের ক্লাব হিসেবে আমাদের জন্য এই ইভেন্ট ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। বড় কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের স্পনসরশিপ না পেলেও শিক্ষকদের সহযোগিতা আর অংশগ্রহণকারীদের ফি থেকে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ উতরে গেছি। আমাদের এই আয়োজনে দেশ-বিদেশের ১ হাজার ৩০০ জন অংশ নিয়েছেন।’

পকেটের টাকায় আয়োজন

তহবিলের অভাবে অনেক সময় নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়েও অনুষ্ঠান করেন ক্লাবের সদস্যরা। কারণ, এর সঙ্গে মিশে থাকে দায়িত্ববোধ আর আবেগ। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রোবো সোসাইটির সভাপতি ইফতিয়ার রহমান বলছিলেন, ‘সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দেখছি, প্রায় প্রতিটি ইভেন্টেই নিজের পকেট থেকে কিছু না কিছু খরচ করতে হয়। ক্লাবের অন্যান্য সদস্যও এভাবে অবদান রাখেন। ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে একটি রোবোটিক ইভেন্ট থেকেই স্পনসর পায়, বড় প্রাইজপুল রাখতে পারে, ২ হাজার টাকার বেশি রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারণ করে, সেখানে আমরা বাধ্য হই প্রাইজপুল ছোট রাখতে। এমনকি ৫০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি রাখতেও অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়; আর এতে প্রত্যাশিত সংখ্যক অংশগ্রহণকারীও পাওয়া যায় না।’

সৃজনশীল সমাধানের পথে

এসব সীমাবদ্ধতার কারণে নানা কৌশলে ইভেন্ট বাস্তবায়নের পথে হাঁটেন ক্লাবের নেতৃত্ব থাকা সদস্যরা। কথা হলো হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহমুদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি আন্তর্জাতিক সংগঠন আইইইই এইচএসটিইউ স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চের চেয়ারপারসন। বাজেট কমিয়ে প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের একটি উদাহরণও দিলেন তিনি, ‘সীমিত রিসোর্সকে আমরা কেবল সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখি না; বরং এটিকে একটি সৃজনশীল চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করি। আমাদের স্টুডেন্ট ব্রাঞ্চে আমরা ক্যাম্পাসের নিজস্ব ল্যাব, ক্লাসরুম ও বিদ্যমান সরঞ্জামের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে খরচ কমানোর চেষ্টা করি। পাশাপাশি দক্ষ সিনিয়র, অ্যালামনাই ও টিম মেম্বারদের ট্রেইনার হিসেবে যুক্ত করে বাহ্যিক ব্যয় কমানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন বা হাইব্রিড–পদ্ধতি ব্যবহার করে আরও বেশি শিক্ষার্থীকে যুক্ত করা সম্ভব। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, টিমওয়ার্ক ও রিসোর্সের সর্বোত্তম ব্যবহারই আমাদের কাজের মূল কৌশল। আমরা সম্প্রতি “বটবিল্ডার বুটক্যাম্প: সেমি-অটোনোমাস সকার বট তৈরির কর্মশালা” আয়োজন করি। বড় কোনো স্পনসরশিপ ছাড়াই আমরা সফলভাবে আয়োজনটা করতে পেরেছি।’

সমাধান কোন পথে?

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখা গেল, নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকার পরও একটি জায়গায় তাঁদের সবার মধ্যে মিল—তাঁরা ভীষণ উদ্যোগী। কেউই থেমে থাকার মানুষ নন। কোনো না কোনোভাবে সমন্বয় করে প্রতি সেমিস্টারেই তাঁরা কিছু না কিছু করে দেখানোর প্রত্যয়ে অনড়; কিন্তু এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে শুধু ইচ্ছাশক্তি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সহায়তা এবং সুযোগের সমতা।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি সোসাইটির প্রেসিডেন্ট শুভ্র দেবনাথ মনে করেন, সমস্যার মূল জায়গাটাই হলো দেশের করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ঢাকাকেন্দ্রিকতা। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ কোম্পানি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় তারা মূলত ঢাকার ক্লাবগুলোর সঙ্গেই কাজ করে। ব্যাংক ও এনজিওগুলোর মধ্যেও একটি প্রবণতা আছে—ঢাকাকেন্দ্রিক প্রমোশন বেশি কার্যকর।’

এই বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু ক্লাবগুলোর চেষ্টাই যথেষ্ট নয়; বরং স্পনসর ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি মনে করেন শুভ্র। তিনি বলেন, ‘ঢাকাকে একমাত্র কেন্দ্র না ভেবে রিজিওনাল জোনগুলোতেও যোগাযোগ ও এনগেজমেন্ট বাড়ানো উচিত। আমরা চাই, শিক্ষার্থীদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের সুযোগ সারা দেশেই ছড়িয়ে যাক; কিন্তু করপোরেট সহযোগিতা ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ কখনোই বড় পরিসরে প্রভাব রাখতে পারবে না। আমি মনে করি, একটি টেকসই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ; যেখানে ক্লাব, অ্যালামনাই, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকেরা একসঙ্গে কাজ করবে। তাহলে আশা করি এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’