সামাজিক মাধ্যমে এখন উদ্যোক্তা হওয়া খুব ঝকঝকে এক গল্প। নতুন পণ্য, নতুন অফিস, নতুন মিডিয়া কভারেজ, নতুন ঘোষণা। দেখে মনে হয়, ব্যবসা শুরু মানেই যেন দ্রুত দৃশ্যমান সাফল্যের দিকে যাত্রা। কিন্তু এই ঝলমলে ছবির আড়ালে আরেকটি নীরব বাস্তবতা আছে। অসংখ্য উদ্যোগ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরই থেমে যাচ্ছে, আর সেই ব্যর্থতার গল্প খুব কমই জনসমক্ষে আসে।
বাংলাদেশের স্টার্টআপ বিনিয়োগে ধস
বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহের ঘাটতি নেই। কিন্তু ২০২৩ সালে দেশে স্টার্টআপ বিনিয়োগ ৪২ শতাংশ কমে ৭২ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে, আর মোট চুক্তি হয় ৪৫টি। এই সংখ্যা শুধু বিনিয়োগের সংকেত দেয় না, এটি আমাদের উদ্যোক্তা পরিবেশের ভঙ্গুরতার কথাও বলে। উদ্যম আছে, আইডিয়া আছে, চেষ্টা আছে; কিন্তু টেকসই ব্যবসা গড়ে তোলার জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা, বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা ও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সংস্কৃতি দরকার, সেটি এখনো দুর্বল।
সমস্যা অর্থের নয়, সংস্কৃতির
সমস্যার বড় অংশটি অর্থের নয়, সংস্কৃতির। আমাদের অনেক তরুণ উদ্যোক্তা ব্যবসা দাঁড় করানোর আগেই তার গল্প দাঁড় করাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। গ্রাহক পাওয়ার আগে প্রচার, পণ্যের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হওয়ার আগে নতুন সেবা ঘোষণা, রাজস্বের পথ পরিষ্কার হওয়ার আগে দৃশ্যমানতা বাড়ানোর চেষ্টা। যেন ব্যবসার আগে বর্ণনা, বাস্তবতার আগে প্রদর্শন। সামাজিক মাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও উসকে দেয়, কারণ সেখানে সংগ্রাম নয়, কেবল হাইলাইটই বেশি দেখা যায়।
স্টার্টআপ ব্যর্থতার ভয়াবহ চিত্র
এই জায়গাতেই মেন্টরশিপকে আমি বিলাসিতা নয়, অবকাঠামো বলে মনে করি। বিশ্বজুড়ে স্টার্টআপ ব্যর্থতার হার খুবই বেশি। নতুন ব্যবসার উল্লেখযোগ্য অংশ প্রথম বছরেই বন্ধ হয়ে যায়, আর দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৯০ শতাংশ স্টার্টআপ টিকে থাকতে পারে না। উইলবার ল্যাবস-এর ১৫০ জন প্রতিষ্ঠাতাকে নিয়ে করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা কোনো না কোনো পর্যায়ে সম্ভাব্য ব্যবসা ব্যর্থতার মুখে পড়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ বলেছেন, সেই সময় তাদের প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না। অর্থাৎ ব্যর্থতা হঠাৎ করে নামে না; তার আগেই থাকে পরিকল্পনার ঘাটতি, বাজার বোঝার দুর্বলতা এবং বাস্তবতা যাচাইয়ের অভাব।
পরিকল্পনার গুরুত্ব
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, একই জরিপে ৭২ শতাংশ প্রতিষ্ঠাতা বলেছেন, শুরু থেকেই ভালো ব্যবসা পরিকল্পনা থাকলে সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ত। ৪০ শতাংশ বলেছেন, সময়মতো দিক বদল বা pivot করাটা ব্যর্থতা ঠেকাতে জরুরি ছিল। তার মানে, উদ্যোক্তার সবচেয়ে দরকারি সহায়তা সব সময় অনুপ্রেরণার ভাষণ নয়। অনেক সময় দরকার এমন একজন, যিনি শুরুতেই বলে দেবেন: বাজার যাচাই হয়নি, এই মডেল টিকবে না, এই প্রসার এখনই ঝুঁকিপূর্ণ, কিংবা আরও সময় নিয়ে পণ্যকে শক্ত করতে হবে।
সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব
সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিভ্রান্তিকর বা অবাস্তব সামাজিক মাধ্যম-প্রভাব তরুণ উদ্যোক্তাদের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তখন তারা কার্যকারিতার চেয়ে স্বীকৃতি খোঁজে বেশি। ব্যবসা মজবুত হওয়ার আগে তারা বড় হতে চায়। দেখা যায়, প্রতিষ্ঠাতারা অর্থ শেষ হয়ে যাওয়াকে ব্যর্থতার কারণ বলেন, কিন্তু তারও আগে সিদ্ধান্তগত ভুল, অপরিপক্ব সম্প্রসারণ এবং সমালোচনাহীন পরিবেশ ব্যবসাকে দুর্বল করে দেয়।
উদীয়মান অর্থনীতিতে মেন্টরের অভাব
উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে এই সমস্যা আরও তীব্র, কারণ সেখানে অভিজ্ঞ মেন্টরের ঘাটতি থাকে। গবেষণা ও বিশ্লেষণ বলছে, মেন্টরশিপের অভাব অনেক স্টার্টআপের জন্য বড় বাধা। অভিজ্ঞ মেন্টরের স্বল্পতা উদ্যোক্তা বিকাশকে থামিয়ে দিতে পারে। অভিজ্ঞ কেউ পাশে থাকলে উদ্যোক্তা একা একা প্রতিটি ভুল করে শেখার বদলে আগেই ঝুঁকি চিনতে পারে, সিদ্ধান্তকে শান দিতে পারে, এবং নিজের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
বাস্তব অভিজ্ঞতা
আমি নিজে গ্লোবাল এন্ট্রাপ্রেনারশিপ বুটক্যাম্পে পাঁচ বছর ধরে ১০০টির বেশি দেশের ১,৫০০-এর বেশি তরুণ উদ্যোক্তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একই ভুল বারবার দেখেছি। কেউ ব্যবসার ভিত মজবুত হওয়ার আগেই প্রবৃদ্ধির গল্পে মুগ্ধ হয়ে পড়ে, কেউ আবার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ছাড়াই একের পর এক সেবা বাড়াতে থাকে। সমস্যা প্রকট হওয়ার পর তারা সহায়তা চায়, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, ব্যর্থতার আগের নীরব সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানেই সঠিক প্রশ্ন, কঠিন বাস্তবতা বিবেচনা করা এবং সময়মতো দিক পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।
আসল সংকট
আসল সংকটটা এখানেই। অনেক উদ্যোক্তা বিপদে পড়েও সাহায্য চান না, কারণ তারা নিজেদের সম্পর্কে জনসমক্ষে যে সফলতার বয়ান তৈরি করেছেন, তার সঙ্গে দুর্বলতার স্বীকারোক্তি মেলাতে পারেন না। তারা ভাবেন, সমস্যা বলা মানে যেন হেরে যাওয়া মেনে নেওয়া। ফলে কথাবার্তা থেমে যায়, সংশোধন থেমে যায়, আর ব্যবসাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। প্রকৃত মেন্টরশিপের কাজ হলো এই নীরবতা ভাঙা। মেন্টর এমন কেউ নন, যিনি শুধু বাহবা দেবেন; তিনি এমন কেউ, যিনি সময় থাকতে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করবেন।
প্রক্রিয়াভিত্তিক মেন্টরশিপের প্রয়োজন
এখানে বিশ্ববিদ্যালয়, ইনকিউবেটর, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি, বিনিয়োগকারী এবং অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের ভূমিকা আছে। আমাদের মেন্টরশিপকে অনুষ্ঠানভিত্তিক নয়, প্রক্রিয়াভিত্তিক করতে হবে। মাসে একবার ছবি তুলে শেষ নয়; দরকার নিয়মিত পর্যালোচনা, বাজার যাচাই, গ্রাহক প্রতিক্রিয়া, রাজস্বের বাস্তব পথ, আর প্রয়োজনে দ্রুত দিক পরিবর্তনের অনুমতি। উদ্যোক্তা তৈরির অনেক কর্মসূচি এখনো উদ্বুদ্ধকরণে বেশি জোর দেয়, কিন্তু টিকে থাকার কৌশল শেখানোয় কম। এই জায়গাটিই বদলাতে হবে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা
বাংলাদেশে সম্ভাবনার ঘাটতি নেই। ঘাটতি আছে সৎ প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সংস্কৃতিতে। আমরা উদ্যোক্তা তৈরির কথা অনেক বলি, কিন্তু উদ্যোক্তাকে টিকিয়ে রাখার ভাষা এখনো যথেষ্ট তৈরি করতে পারিনি। সামাজিক মাধ্যমে দেখা উদ্যোক্তার জীবন কোনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতা নয়; সেটি একটি বাছাই করা প্রদর্শনী। টেকসই ব্যবসা গড়ে ওঠে আড়ালে, ভুল স্বীকারে, বাজার থেকে শেখায়, এবং সময়মতো কঠিন কথা শোনার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের পরবর্তী সফল উদ্যোক্তা প্রজন্ম আরও বেশি হাইপ থেকে আসবে না। তারা তৈরি হবে আরও বেশি সততা, আরও বেশি কাঠামোবদ্ধ সহায়তা, এবং আরও বেশি সত্যিকারের মেন্টরশিপ থেকে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিক্ষক, উদ্যোক্তা মেন্টর ও প্রশিক্ষক।



