নেপালে কার্যক্রম পরিচালনা করছে পাঠাও। হিমালয়ের কোলঘেঁষা নেপালের পোখরা শহর ঘুরতে গিয়ে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন বাংলাদেশের তরুণ আবু রিফাত জাহান। এই তরুণ অচেনা পাহাড়ি রাস্তায় যাতায়াতের জন্য মুঠোফোন বের করতেই অবাক হয়ে দেখেন, সেখানে ভাড়ায় যাত্রীসেবা পরিচালনা করছে বাংলাদেশের রাইড শেয়ারিং অ্যাপ পাঠাও। নিজ দেশের একটি প্রযুক্তিগত সেবার সুদূর নেপালের পাহাড়ি জনপদে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভরসা হয়ে ওঠার দৃশ্য দেখে রিফাতের বিস্ময়ের সীমা নেই। রিফাতের মতো আরেক তরুণ নিশাত আনজুমও নেপাল ভ্রমণে গিয়ে পাঠাও অ্যাপের ফুড ডেলিভারি সেবার মাধ্যমে পছন্দের খাবার কিনে বেশ বিস্মিত হয়েছেন।
নেপালের ২০ শহরে পাঠাও
বর্তমানে নেপালের ২০টি শহরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে পাঠাও অ্যাপ। রাইড শেয়ারিং ও ফুড ডেলিভারির পাশাপাশি সেখানে লজিস্টিকস, কুরিয়ার সার্ভিস ও হোম সার্ভিস সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিযোগী অ্যাপের ভিড়ে নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও স্থানীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে নেপালের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে পাঠাও অ্যাপ।
স্থানীয় বাজারের জন্য কৌশলগত পরিবর্তন
নেপালের বাজার ও ভৌগোলিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখে পাঠাও তাদের ব্যবসায়িক মডেলে বেশ কিছু কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে। এ বিষয়ে পাঠাও নেপালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়েশু ঠাকালি প্রথম আলোকে জানান, কাঠমান্ডুর বাইরে পর্যটন শহর পোখরা ও চিতোয়ানের মতো বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোয় পাঠাও অ্যাপের শক্ত অবস্থান রয়েছে। রাইড শেয়ারিংয়ের পাশাপাশি প্রায় দুই বছর আগে থেকে কুরিয়ার ও লজিস্টিকস সেবা দিচ্ছে পাঠাও। প্রথম দুই বছর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে লজিস্টিকস ব্যবসাকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে পাঠাও। এ ছাড়া নেপালের নাগরিকদের গৃহস্থালি সমস্যার ডিজিটাল সমাধানের জন্য সম্প্রতি চালু করা হয়েছে পাঠাও মারমট (স্থানীয় নেপালি ভাষায় মেরামত)। এর মাধ্যমে ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বিং, ক্লিনিং ও এসি বা ওয়াশিং মেশিন মেরামতের দক্ষ কর্মী এখন এক ক্লিকেই পাচ্ছেন নেপালের গ্রাহকেরা। দীর্ঘ মেয়াদে নেপালে একটি পূর্ণাঙ্গ ই–কমার্স ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে পাঠাও। ফলে স্থানীয় লোকজন এক অ্যাপেই যাতায়াত, খাবার, কেনাকাটা ও দৈনন্দিন সেবা পাচ্ছেন।
প্রযুক্তিগত অভিযোজন
পাঠাও নেপালের চেয়ারম্যান ও পাঠাও বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সমতল ভূমির তুলনায় নেপালের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও ট্রাফিক–সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত মডেল হুবহু নেপালে ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না। এই ভৌগোলিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের প্রকৌশলীরা পাঠাও অ্যাপের অ্যালগরিদম ও প্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন। ঢাকার দুই কিলোমিটার রাস্তা আর কাঠমান্ডু বা পোখরার দুই কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তার ট্রাফিক জ্যাম, সরু গলি ও যাতায়াতের সময় সম্পূর্ণ আলাদা। এ বাস্তবতায় অ্যাপের নকশা স্থানীয় রাস্তার ধরন অনুযায়ী করা হয়েছে। প্রযুক্তির পাশাপাশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয়করণের ওপর। অ্যাপের ভাষা, যোগাযোগের ধরন, বিপণন কৌশল ও কাস্টমার পলিসি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেন নেপালের ব্যবহারকারীদের কাছে একে কোনো বিদেশি অ্যাপ মনে না হয়। সম্প্রতি নেপালে পাঠাও হেলি নামের বিশেষ সেবা চালু করা হয়েছে। এই সেবার মাধ্যমে পাহাড়ি অঞ্চল, তীর্থস্থান ও দর্শনীয় স্থানগুলোয় দ্রুত ও আরামদায়ক হেলিকপ্টার যাত্রার সুযোগ পাচ্ছেন ব্যবহারকারীরা। একসঙ্গে সর্বোচ্চ পাঁচ যাত্রী এই সেবা ব্যবহার করতে পারবেন। অ্যাপ থেকেই মিলছে সব সেবা।’
প্রযুক্তি ও তথ্য নিরাপত্তা
যেকোনো বড় টেক প্ল্যাটফর্মের জন্য মেরুদণ্ড হলো তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও তথ্যের নিরাপত্তা। পাঠাওয়ের পুরো কারিগরি অবকাঠামো, কেন্দ্রীয় সার্ভার ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা ঢাকা থেকে করা হয়। এ বিষয়ে ফাহিম আহমেদ বলেন, নেপালের কার্যক্রমকে স্রেফ বাংলাদেশের অনুলিপি হিসেবে চালানো হয় না। নেপালের কর্মীরা স্থানীয় ব্যবহারকারীদের আচরণ, বাজারের শূন্যতা ও আইনি প্রয়োজনীয়তাগুলো চিহ্নিত করে ঢাকার কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেন।
আইনি ও নীতিগত সম্মতি
উদীয়মান প্রযুক্তি খাতের মতো নেপালেও রাইড শেয়ারিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট–সংক্রান্ত আইনি নীতিমালা এখনো বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে পাঠাও শুরু থেকেই নেপালের প্রচলিত সব আইন ও নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলছে। দেশটির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে একটি টেকসই ও কার্যকর আইনি কাঠামো গঠনেও তারা ইতিবাচকভাবে কাজ করছে। ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রেও নেপালের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করছে পাঠাও।



