ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভিডিও বানিয়ে এক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালানোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দফায় দফায় চলা এই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২৫ জন গ্রামবাসী গুরুতর আহত হয়েছেন। শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভাঙ্গা উপজেলার চুমুরদী ইউনিয়নের বাবনাতলা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মহাসড়কের ওপর এই সংঘর্ষ ঘটে।
ঘটনার সূত্রপাত
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক সপ্তাহ আগে আকরাম শেখ নামের এক স্থানীয় টিকটকার চুমুরদী ইউনিয়ন পরিষদে যান। সেখানে গিয়ে ‘ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহাগ মোল্লা গরিবদের ঈদের চাল আত্মসাৎ করেছেন’—এমন একটি মনগড়া অভিযোগ এনে ভিডিও ধারণ করেন এবং তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হলে ভাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খবরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্বয়ং চুমুরদী ইউনিয়ন পরিষদে পরিদর্শনে যান। তিনি তদন্তের স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে চেয়ারম্যান সোহাগ মোল্লা ও ইউপি সদস্য আনোয়ার উদ্দিনকে ফোন করে চাল বিতরণের সঠিক তথ্য জানতে চান।
প্রকৃত সত্য উদঘাটন
প্রকৃত সত্য ও সঠিক তথ্য না জেনে এভাবে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ায় চুমুরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহাগ মোল্লা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, ইউপি চেয়ারম্যান সোহাগ মোল্লা এবং অভিযুক্ত টিকটকার আকরাম শেখ—উভয়ের বাড়িই উপজেলার বাবনাতলা গ্রামে।
সংঘর্ষের বিবরণ
এই ঘটনার জেরে শুক্রবার সন্ধ্যায় বাবনাতলা বাসস্ট্যান্ডে টিকটকার আকরাম শেখকে পেয়ে চেয়ারম্যানের ভাই চন্দন মোল্লা সেই মিথ্যা অপপ্রচারের কারণ জানতে চান। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে আকরাম ও চন্দন মোল্লার মধ্যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয় এবং তারা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যে এই হাতাহাতি এক পক্ষ আরেক পক্ষকে মারধরের রূপ নেয়। এই মারামারির খবর বাবনাতলা গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে আকরাম শেখের পক্ষের স্থানীয় মাতুব্বর শাহাবুদ্দিন মোল্লার লোকজন লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দ্রুত বাবনাতলা বাসস্ট্যান্ডে এসে জড়ো হয়। অপরদিকে, চন্দন মোল্লার পক্ষে চেয়ারম্যান সোহাগ মোল্লার সমর্থকেরাও পাল্টা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঢাল-সড়কি সহ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান নেয়। দুই পক্ষ মুখোমুখি হতেই পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত ঘণ্টাব্যাপী চলা দফায় দফায় এই সংঘর্ষে ২৫ জন গ্রামবাসী রক্তাক্ত ও আহত হন। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
পুলিশের হস্তক্ষেপ
সংঘর্ষের খবর পেয়ে ভাঙ্গা থানা পুলিশের একটি বিশাল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে সংঘর্ষের পর থেকে পুরো বাবনাতলা গ্রাম ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চরম থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। নতুন করে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা সংঘর্ষ না ঘটে, সে জন্য এলাকায় বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পক্ষগুলোর বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে চুমুরদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহাগ মোল্লা বলেন, ‘আমাদের গ্রামের টিকটকার আকরাম শেখ কোনো প্রকার সত্যতা না জেনে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে ফেসবুকে ভিডিও বানিয়ে অপপ্রচার করেছে, যা আমার সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন করেছে। আজ সন্ধ্যায় আমার ভাই চন্দন এই মিথ্যাচারের কারণ জানতে চাইলে আকরাম উল্টো উত্তেজিত হয়ে চন্দনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। পরবর্তীতে এই ঘটনার সূত্র ধরে দুই পক্ষের সাধারণ লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে বেশ কিছু মানুষ আহত হন।’
পুলিশের বক্তব্য
ভাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, একটি ফেসবুক ভিডিওর সূত্র ধরে দুই পক্ষের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং বর্তমানে এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। ওসি আরও উল্লেখ করেন, এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের কাছ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



