কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুত কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতের চাকরি, ব্যবসা ও পেশাগত দক্ষতার ক্ষেত্রে এআই সম্পর্কে জ্ঞান এবং এর ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ কম হারে এআই টুল ব্যবহার ও গ্রহণ করছেন। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী এআই-সম্পর্কিত পেশাজীবীদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২২-৩০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বিদ্যমান ডিজিটাল বৈষম্য আরও প্রকট হবে
এমন পরিস্থিতিতে নারীরা যদি এআই দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকেন, তাহলে বিদ্যমান ডিজিটাল জেন্ডার ডিভাইড আরও প্রকট হবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সুযোগগুলো থেকে তারা বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন। বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা খাত নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে এসব খাত দ্রুত এআই-নির্ভর হয়ে পড়ছে।
এআই ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা গড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, আর কিছু ক্ষেত্রে তা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নত হতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে এআই-সম্পর্কিত দক্ষতার চাহিদা ও আয় উভয়ই বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএলও’র গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বের ২৬-৩৮ শতাংশ চাকরি কোনো না কোনোভাবে জেনারেটিভ এআই দ্বারা প্রভাবিত হবে এবং ৮-১৪ শতাংশ চাকরিতে সরাসরি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
তাই ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে, উচ্চমূল্যের কাজ পেতে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করতে নারীদের জন্য এআই দক্ষতা অর্জন এখন শুধু প্রয়োজন নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য দাবি।
এআই উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ কম, পক্ষপাতের ঝুঁকি বেশি
একটা বিষয় হচ্ছে, প্রযুক্তি কখনোই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়; এটি যেসব মানুষ তৈরি করেন এবং যেসব তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়, তার প্রতিফলনই প্রযুক্তিতে দেখা যায়। তাই এআই উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ কম হলে অ্যালগরিদমে লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাতিত্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বর্তমানে বিশ্বে এআই পেশাজীবীদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২২ শতাংশ, যা প্রযুক্তি খাতে প্রতিনিধিত্বের বড় ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
এর ফলে নিয়োগ, ঋণ প্রদান, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা কনটেন্ট তৈরির মতো ক্ষেত্রে ব্যবহৃত এআই সিস্টেমগুলো নারীদের সম্পর্কে ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত দিতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় ইতিমধ্যে দেখা গেছে, কিছু এআই মডেল পেশাগত ভূমিকায় নারীদের কম প্রতিনিধিত্ব করে বা প্রচলিত লিঙ্গধারণাকে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করে। একই সঙ্গে ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, এআই গবেষণার ক্ষেত্রে এখনো ৩৮ শতাংশ জেন্ডার গ্যাপ বিদ্যমান, যা প্রযুক্তি উন্নয়নে নারীদের সীমিত অংশগ্রহণের প্রতিফলন।
এআই-চালিত ব্যবসায় নারী উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা
প্রযুক্তিখাতে কাজের সময় দেখছি, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এআই প্রযুক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনার ধরন বদলে দিচ্ছে। বর্তমানে এআই ব্যবহার করে গ্রাহকের চাহিদা বিশ্লেষণ, স্বয়ংক্রিয় কাস্টমার সাপোর্ট, বিক্রয় পূর্বাভাস এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাককিন্সির তথ্য অনুযায়ী, জেনারেটিভ এআই কার্যকরভাবে ব্যবহার করলে বিপণন ও বিক্রয় কার্যক্রমে ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রয় ব্যয় হ্রাস করা সম্ভব।
ফলে নারী উদ্যোক্তারা কম খরচে অধিক গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে এবং দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারেন। বিশেষ করে ই-কমার্স ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায় এআই গ্রাহকের আচরণ বিশ্লেষণ করে সঠিক পণ্য সুপারিশ, বাজারের প্রবণতা শনাক্ত এবং ২৪/৭ কাস্টমার সার্ভিস প্রদানে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-চালিত ব্যবসাগুলোতে উৎপাদনশীলতা গড়ে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই নারী উদ্যোক্তারা যদি এআই দক্ষতা অর্জন করেন, তাহলে তারা শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতেও আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারবে যা তাদের ব্যবসার টেকসই প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে আরও শক্তিশালী করবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন জরুরি
নারীরা যত বেশি প্রোগ্রামার, ডেটা অ্যানালিস্ট, গবেষক ও নীতিনির্ধারক হিসেবে যুক্ত হবেন, ততই এআই হবে বৈচিত্র্যপূর্ণ, দায়িত্বশীল এবং সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টিকারী। নারীদের এআই দক্ষতায় এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তর থেকেই ডিজিটাল সাক্ষরতা, কোডিং, ডেটা ও এআই-ভিত্তিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি জরুরি। শুধু প্রযুক্তি শিক্ষা নয়, মেয়েদের জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ এবং নারী রোল মডেল তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) বিষয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ৩৫ শতাংশ, যা ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি খাতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত করে। তাই স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের প্রযুক্তি শিক্ষায় উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।



