বাংলাদেশে যাঁরা একটু চাপা, শ্যামলা বা কালো রং নিয়ে জন্মেছেন, তাঁদের প্রায় প্রত্যেককেই কোনো না কোনোভাবে প্রতিদিন একবার করে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, এই গায়ের রংটা ঠিক কাঙ্ক্ষিত নয়। বন্ধুদের টিজ থেকে আত্মীয়ের বুলি, ম্যাট্রিমোনিয়াল বিজ্ঞাপন থেকে ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপন; কিছু না কিছু ইঙ্গিত দিয়ে যায়, গায়ের রং যেন একটি অসম্পূর্ণতা। কাউকে বলা হয় রোদে কম যেতে, কাউকে হালকা রঙের কাপড় এড়িয়ে চলতে, কাউকে মুখে আরও বেশি ক্রিম মাখতে। করপোরেট চাকরিতে কেউ কেউ টের পান, কেবল গায়ের রঙের জন্য আরেক সহকর্মীর চেয়ে তাঁকে একটু বেশি পরিশ্রম করতে হচ্ছে। বিপরীত লিঙ্গের মনোযোগ পেতে গড়ে তুলতে হচ্ছে ব্যক্তিত্ব ও চার্ম, যেখানে কোনো ফর্সা বন্ধু স্রেফ একটি হাসিতেই কাজ সেরে ফেলছেন।
অথচ এই বঞ্চনার পুরো হিসাবটাই উল্টো। কারণ, যে গায়ের রংকে আমরা নিচু চোখে দেখতে শিখেছি, পা-মাটিতে-না-পড়া সেই ফর্সা মানুষগুলোর অস্তিত্বই আসলে তার কাছে ঋণী। গোটা মানবজাতির অস্তিত্বই তার কাছে ঋণী। ব্যাখ্যা করি।
মেলানিনের ভূমিকা
আপনার গায়ের রং ঠিক করে দেয় মেলানিন। মেলানিন প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া একটি জৈব অণু, যার রং আমাদের চোখে বাদামি-কালো। এটি আপনার ত্বকের কোষের ভেতরে তৈরি হয়। যত বেশি তৈরি হয়, আপনার চামড়া তত শ্যামলা দেখায়। আপনার চামড়ায় কতটুকু মেলানিন থাকবে, তা ঠিক করে দেয় মা-বাবার কাছ থেকে পাওয়া জিন।
জিন মানে আপনার ডিএনএতে লেখা ছোট ছোট সাংকেতিক নির্দেশনা—‘এই কোষটা ঠিক এতটুকু মেলানিন বানাবে’, ‘ওই কোষটা এত গুণ বানাবে’। রসায়নের অবধারিত পরিক্রমায় সেই নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করেই আপনার শরীর কাজ করে। কাজেই আপনার গায়ের রং এমন কিছু নয়, যা আপনি ক্রিম মেখে বদলে ফেলতে পারবেন। এটি আপনার মা-বাবার, তাঁদের মা-বাবার, তারও আগের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে আপনার কাছে এসে পৌঁছানো একটি উত্তরাধিকার।
সেই উত্তরাধিকার এক দিনে তৈরি হয়নি। কোন জায়গার মানুষের চামড়ায় কতটুকু মেলানিন থাকবে, সেটা গড়ে উঠেছে কোটি কোটি বছর ধরে, লাখ লাখ প্রজন্ম ধরে, প্রকৃতির এক নির্মোহ হিসাবের মধ্য দিয়ে। সহজ হিসাব: যেকোনো জায়গায় কোনো একটি মেলানিনের মাত্রা মানুষকে একটু বেশি সুস্থ রাখে, সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে একটু বেশি সাহায্য করে; অন্য মাত্রাগুলো করে না। যেটি সাহায্য করে, তার পেছনের জিন পরের প্রজন্মে একটু বেশি করে পৌঁছায়। কারণ, যাদের চামড়ায় মেলানিন সুবিধাজনক মাত্রায় আছে, তাদের সন্তানেরা সন্তান নেওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকার সম্ভাবনা একটু হলেও বেশি। কয়েক শ প্রজন্ম ধরে এটি চলতে থাকলে, সেই জায়গার রোদের সঙ্গে যে মেলানিন-মাত্রাটা সবচেয়ে ভালো খাপ খায়, সেটাই একসময় হয়ে দাঁড়ায় সেখানকার মানুষের চামড়ার স্বাভাবিক মাত্রা। এটাই প্রাকৃতিক নির্বাচন। কিন্তু রোদের সঙ্গে চামড়ার এই খাপ খাওয়া বলতে আসলে কী বোঝায়? পুরোটাই আসলে রসায়ন।
রোদের সঙ্গে চামড়ার রসায়ন
প্রথমে বিষুবরেখার আশপাশের অঞ্চলগুলোর তীব্র রোদ নিয়ে বলি। আমাদের রক্তে ফোলেট নামে একটি পুষ্টি উপাদান থাকে। তীব্র রোদের অতিবেগুনি রশ্মি সেটাকে ভেঙে ফেলে। এই ফোলেট সুস্থ বাচ্চা জন্ম নেওয়ার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চিকিৎসকেরা আজও প্রত্যেক গর্ভবতী নারীকে ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট খেতে বলেন। কারণ, মাতৃগর্ভে শিশুর মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্ক ঠিকঠাক গড়ে তুলতে শরীরের ফোলেটই লাগে। ফোলেট কম পড়লে গর্ভপাত হয়, বন্ধ্যত্ব হয়, অপরিপক্ব মেরুদণ্ড নিয়ে শিশু জন্মায়। চড়া রোদে ফর্সা চামড়ার ভেতরের ফোলেটের ভেঙে পড়াটা ল্যাবে বসে রীতিমতো মেপে দেখা যায়।
১৯৭৮ সালে দুই গবেষক রিচার্ড ব্র্যান্ডা ও জন ইটন পরীক্ষা করে দেখান, কড়া রোদের মতো আলোয় মাত্র এক ঘণ্টা রাখলেই রক্তরসের ফোলেটের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ভেঙে যায়। মেলানিন সেই চড়া রোদের অতিবেগুনি রশ্মিকে শুষে নেয়। তাতে নিচের ফোলেট রক্ষা পায়। তার মানে, চড়া রোদের নিচে যাদের চামড়ায় মেলানিন বেশি, তাদের ফোলেট রক্ষা পায়, তাদের সুস্থ সন্তান বেশি বাঁচে। কাজেই বেশি রোদের জায়গায় প্রকৃতির হিসাব দাঁড়ায়; যত বেশি মেলানিন, তত ভালো।
এবার উল্টো দিক; দুর্বল রোদের অঞ্চলগুলোর গল্প। মরু থেকে যত মেরুর দিকে আগাবেন, এ গল্প তত প্রাসঙ্গিক হতে থাকবে। দুর্বল রোদেরও সমস্যা আছে। আপনার চামড়ায় আবার রোদ লাগাও দরকার, কারণ রোদ ছাড়া শরীর ভিটামিন ডি বানাতে পারে না। আর যথেষ্ট ভিটামিন ডি না থাকলে হাড় নরম হয়ে বেঁকে যায়; এই রোগটির নাম রিকেটস।
মেয়েদের ক্ষেত্রে রিকেটস পেলভিসকে বিকৃত করে দেয়। আধুনিক অস্ত্রোপচার আসার আগে মানুষের ইতিহাসের সিংহভাগজুড়েই বিকৃত শ্রোণি প্রসবের সময় মা ও শিশু—দুজনকেই মেরে ফেলত। এখন যেখানে রোদ এমনিতেই দুর্বল—মেরুর কাছাকাছি, যেখানে শীতকালে দিনের আলো অল্প সময়ের জন্য থাকে, তা-ও তির্যকভাবে আসে—সেখানে বেশি মেলানিন থাকলে চামড়া ওই অল্প রোদটুকুও আটকে দেয়। ফলে শরীর যথেষ্ট ভিটামিন ডি বানাতে পারে না। সেখানে উল্টো হিসাব: যাদের চামড়ায় মেলানিন কম, তারা বেশি ভিটামিন ডি বানায়, শক্ত হাড় পায়, প্রসবে বেশি বেঁচে থাকে, বেশি সুস্থ সন্তান রেখে যায়। কাজেই কম রোদের জায়গায় প্রকৃতির হিসাব ঠিক উল্টো; যত কম মেলানিন, তত ভালো।
তাহলে কী দাঁড়াল? চড়া রোদের জায়গা বেশি মেলানিন চায়, দুর্বল রোদের জায়গা কম। প্রতিটা অক্ষাংশের নিজস্ব একটি আদর্শ মাত্রা আছে, আর সেটা ঠিক করে দেয় সেখানকার রোদের জোর।
এ কথার সত্যতা আপনি পৃথিবীর মানচিত্রেই যাচাই করতে পারেন। নৃবিজ্ঞানী নিনা ইয়াবলনস্কি ও জর্জ চ্যাপলিন স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া অতিবেগুনি বিকিরণের তথ্য দিয়ে দুনিয়ার নানা প্রান্তের আদিবাসী মানুষদের গায়ের রং মিলিয়ে দেখিয়েছেন, সবচেয়ে কালো মানুষেরা থাকেন বিষুবরেখার আশপাশে, যেখানে রোদ সবচেয়ে চড়া। সবচেয়ে ফর্সা মানুষেরা থাকেন মেরুর কাছাকাছি, যেখানে রোদ সবচেয়ে দুর্বল। বাকিরা পড়েন ঠিক মাঝখানে, মোটামুটি যেখানকার রোদের জোর যেমন। মেকানিজম যা বলে, পৃথিবী ঠিক তা-ই দেখায়। গায়ের রং যদি এলোমেলো ব্যাপার হতো কিংবা জাতের কোনো স্থায়ী চিহ্ন হতো, তাহলে গোটা বিশ্বজুড়ে রোদের সঙ্গে এত পরিষ্কারভাবে মিলে যেত না।
ডিএনএর পাতায় রঙের ইতিহাস
এবার আরও গভীরে, একটু ডিএনএর দিকে তাকাই। কারণ ডিএনএ আমাদের আরও একটি বিষয় বলে দেয়। এই দুই রঙের মধ্যে কোনটি আগে এসেছে, কোনটি পরে। ত্বকের মেলানিন উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিন, তার নাম SLC24A5। সেখানে কালো ও ফর্সা সংস্করণের মধ্যে ফারাকটা সামান্য—ডিএনএর একটিমাত্র নিউক্লিওটাইড একটি জায়গায় বদলে গেছে। প্রায় প্রতিটি আফ্রিকান বা এশীয় গাঢ় রঙের মানুষ ওই জায়গায় বহন করেন একটি নির্দিষ্ট নিউক্লিওটাইড—কালো চামড়ার সংস্করণ। আর প্রায় প্রতিটি ইউরোপীয়, শতকরা ৯৯ থেকে ১০০ শতাংশই বহন করেন বদলে যাওয়া নিউক্লিওটাইডটি—ফর্সা চামড়ার সংস্করণ। মানবজাতির সিংহভাগের মধ্যে যে সংস্করণ পাওয়া যায়, যে সংস্করণ আছে মানব ইতিহাসের পুরোনো সব ফসিলে—সেটাই আদি। ইউরোপীয় সংস্করণটি পরে এসে বসা একটি মিউটেশন, ওই একটিমাত্র নিউক্লিওটাইডের জায়গায়। ফর্সা চামড়া আসলে আদিম নকশার ওপর বসানো একটি ছোট্ট সংশোধন।
এই মিউটেশনটি ঠিক কখন এসে চেপে বসল, সেটাও আমরা মাপতে পারি। এখন প্রাচীন কঙ্কাল থেকে ডিএনএ বের করা সম্ভব, হাড়ের বয়স রেডিওকার্বন পদ্ধতিতে নির্ণয় করা সম্ভব এবং ওই মানুষটি জিনের কোন সংস্করণ বহন করত—তা সরাসরি পড়ে দেখাও সম্ভব। বিভিন্ন সময়ের শত শত কঙ্কালের জন্য এটা করলে একটি স্পষ্ট সময়রেখা ফুটে ওঠে।
আজ থেকে প্রায় সাত-আট হাজার বছর আগে স্পেন, লুক্সেমবার্গ ও হাঙ্গেরিতে বাস করা শিকারি-সংগ্রাহক মানুষদের জিনে তখনো ছিল কালো সংস্করণটি—তাঁরা ছিলেন কালো চামড়ার, তবে অনেকের চোখ ছিল নীল। ইউরোপের অনেক জায়গায় ফর্সা চামড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছে গত কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই—কৃষিকাজ আবিষ্কারেরও পরে। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে রাখা ব্রিটেনের প্রায় ১০ হাজার বছরের পুরোনো কঙ্কাল চেডার ম্যানের ডিএনএ বিশ্লেষণ বলে, তার গায়ের রংও ছিল কালো বা গাঢ় বাদামি।
আর রোদই যে গায়ের রং গড়ে দিয়েছে, তার আরেকটি যৌক্তিক প্রমাণ: ফর্সা চামড়া পৃথিবীতে একাধিকবার, আলাদা আলাদাভাবে বিবর্তিত হয়েছে। ইউরোপীয় ও পূর্ব এশীয়রা ফর্সা হয়েছে নিজেদের মতো করে, সম্পূর্ণ আলাদা জিনের মাধ্যমে। আলাদা মিউটেশন, কিন্তু কাজ একটাই। দুটি জনগোষ্ঠী যারা কখনো মেশেনি, তাদের মধ্যে একই ফল আলাদাভাবে দুবার এসে যাওয়া কোনো কাকতাল হতে পারে না। এর একমাত্র কারণ, দুই জায়গাতেই দুর্বল রোদের প্রাকৃতিক নির্বাচন জনগোষ্ঠীকে একদিকে ঠেলে দিয়েছে।
কালো চামড়া না থাকলে কোনো মানুষই থাকত না
এবার শুরুতে যে কথাটি বলেছিলাম, সেটি আস্তে আস্তে নিজে নিজেই দাঁড়াচ্ছে। লাখ লাখ বছর ধরে চড়া আফ্রিকান রোদের ভেতর কালো চামড়াই গোটা মানবজাতির ফোলেটকে আগলে রেখেছে, যাতে সুস্থ সন্তান জন্মাতে পারে, যাতে জিন পরের প্রজন্মে যেতে পারে। কালো চামড়া না থাকলে কোনো মানুষই থাকত না। আজকের কোনো কালো মানুষও থাকত না, কোনো ফর্সা মানুষও না। তারপর কেউ কেউ যখন উত্তরের দিকে চলে গেল, রোদ যখন কমে এল, তখনই কেবল চামড়া হালকা হওয়াটা লাভজনক হিসেবে দেখা দিল, ফর্সা জনগোষ্ঠী বাড়তে শুরু করল। আজকের যে ফর্সা ইউরোপীয় কিংবা ফর্সা পূর্ব এশীয় মানুষ বিশ্বজুড়ে সৌন্দর্যের মাপকাঠি, তাঁদের পূর্বপুরুষেরাও এক দিন আফ্রিকান কালো ছিলেন। সেই কালো চামড়াই তাঁদের গোটা জিনগুলোকে এত দূর বয়ে এনেছে।
আমাদের নিজেদের গল্প: বদ্বীপের শ্যামল রং
এবার আসি আমাদের নিজেদের গল্পে, তাকাই বঙ্গদেশের দিকে। এই বদ্বীপে প্রথম যাঁরা থিতু হয়েছিলেন, তাঁরা পায়ে হেঁটে এখানে এসেছিলেন আফ্রিকা থেকে, দক্ষিণ এশিয়ার উপকূল ধরে, আজ থেকে ৫০ হাজারেরও বেশি বছর আগে। এখানকার রোদ আফ্রিকার মতোই চড়া, তাই তাঁরা কালোই থেকে গিয়েছিলেন। তাঁদের কঙ্কাল আমাদের হাতে নেই, কিন্তু তাঁদের সবচেয়ে কাছের জীবিত আত্মীয়েরা, বঙ্গোপসাগরের আন্দামান দ্বীপের আদিবাসীরা আজও গভীর কালো। তাঁরা এখানে ছিলেন বেদের আগে, সংস্কৃতের আগে, বর্ণপ্রথার আগে। তাঁরাই আদি বাঙালি, যে ভিতের ওপর পরে বাকি সবকিছু বসেছে।
কারণ, পরে আরও মানুষ এসেছেন, ঠান্ডা সব অঞ্চল থেকে। তাঁদের প্রত্যেককে আজও ডিএনএতে আলাদা স্তর হিসেবে চিনে নেওয়া যায়। ইরান থেকে আসা কৃষক; আরও উত্তরের, মধ্য এশিয়ার তৃণভূমির পশুপালক রাখাল—এঁরা ছিলেন অপেক্ষাকৃত ফর্সা। আর এই অঞ্চলের জন্য স্বতন্ত্র হিসেবে পূর্ব দিক থেকে আসা মানুষও আছেন। বাঙালির জিনোমে আছে একটি স্পষ্ট পূর্বদেশীয় স্তর, যা উপমহাদেশের বেশির ভাগ মানুষের নেই। এঁরা সবাই এখানে আগে থেকে বাস করা কালো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে গেছেন, ঘর বেঁধেছেন।
‘বাঙালি শ্যামবর্ণ’ বলতে আমরা যা বুঝি, তা আসলে এটাই: এক কৃষ্ণকায় আদি জনগোষ্ঠী, যা ৫০ হাজার বছর ধরে এই রোদে পোড়া মাটির সঙ্গে খাপ খেয়ে আছে, আর তার ওপর মেশানো উত্তর ও পূর্ব থেকে আসা নতুন মানুষদের কিছুটা হালকা রং। তাই একই পরিবারে যখন এক ভাই ফর্সা আর আরেক ভাই কালো, তাঁদের মধ্যে আসল ফারাকটা কেবল একটাই—কে কোন স্তরটা কতখানি উত্তরাধিকারে পেয়েছেন। জিনের মধ্যে একটুখানি এদিক-ওদিক। ফর্সা জন কেবল সাম্প্রতিক উত্তরের আগন্তুকের রং একটু বেশি বহন করছেন আর এই মাটির আদি মানুষের রং একটু কম।
আর এই মাটির কথাই যদি ভাবেন—বাংলাদেশ আছে মোটামুটি ২০ থেকে ২৬ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে, পুরোদস্তুর গ্রীষ্মমণ্ডলে, প্রায় সারা বছরের চড়া রোদে। এখানে কালো চামড়া ঠিক তার কাজটাই করে: অতিবেগুনি রশ্মি শুষে নেয়, নিচের ফোলেট আর ডিএনএকে আগলে রাখে। এখানে ফর্সা চামড়া পোড়ে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যায়। আর যে সুরক্ষা কালো চামড়া বিনা মূল্যে দেয়, সেটা ফর্সাদের কিনতে হয় বোতলে ভরে। অর্থাৎ আমরা যে চামড়াকে নিচু চোখে দেখি, সেটাই আসলে এই দেশের সঙ্গে খাপ খায়। আর যে চামড়ার পেছনে ছুটি, আমাদের রোদের সঙ্গে সেটাই সবচেয়ে বেমানান।
ফর্সা পূজার শিকড়
তাহলে ফর্সার এই পূজা এল কোত্থেকে, যদি এখানে তার কোনো জৈবিক যুক্তিই না থাকে? এর কোনো একটিমাত্র সরল উত্তর নেই—এটি হয়েছে ধাপে ধাপে।
প্রথম ধাপে, ওই যে উত্তর থেকে আসা অপেক্ষাকৃত ফর্সা মানুষেরা এলেন। এঁরা এসেছিলেন স্টেপের বিশাল খোলা তৃণভূমি থেকে—আর সেই ভূগোলই তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছিল ঘোড়া, রথ আর যাযাবর-যোদ্ধার জীবন, যে সুবিধা নদীমাতৃক এই বদ্বীপের কৃষিজীবী মানুষের ছিল না। সুবিধাটা ছিল নিতান্তই তাঁদের ভূগোলের, রক্তের কিছু না। সেই জোরেই তাঁরা এসে বসলেন সমাজের ওপরের ধাপে, ক্ষমতার আসনে—বিজয়ী আগন্তুক বলে, ফর্সা বলে না। তাঁদের ফর্সা রংটি স্রেফ সঙ্গে এসেছিল, ক্ষমতার সঙ্গে ঘটনাক্রমে এক ফ্রেমে ঢুকে গিয়েছিল।
ক্ষমতাবানেরা চিরকালই চান তাঁদের রক্ত, তাঁদের মর্যাদা যেন নিচে না নামে। সেই চাওয়া থেকেই আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে গেল বর্ণপ্রথা—মানুষেরই বানানো একটি নিয়ম, যেখানে নিজের স্তরের বাইরে বিয়ে নিষিদ্ধ। পরে ধর্মীয় বিধানে সেই নিয়ম পবিত্রতার মোড়ক পেল আর হাজার হাজার বছর ধরে কড়াভাবে চলল।
এই একটি নিয়মই গায়ের রঙের ফারাকটাকে মিলিয়ে যেতে দিল না। যাঁরা ওপরে ছিলেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যেই বিয়ে করে ওপরেই থেকে গেলেন—আর তাঁদের অপেক্ষাকৃত ফর্সা রংটাও রয়ে গেল ওপরের ধাপেই। জিনতত্ত্ব বলছে, ভারতবর্ষে চার-পাঁচ হাজার বছর আগে নানা জনগোষ্ঠীর ব্যাপক মিশ্রণ ঘটেছিল। তারপর অন্তর্বিবাহের চল শুরু হলে সেই মিশ্রণ থেমে যায় আর গোটা কাঠামোটা যেন জমে যায়। এটি আজও ডিএনএতে ধরা পড়ে: গোটা দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ওই উত্তরের জিন উঁচু বর্ণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আর ধাপে ধাপে নিচে নামতে নামতে তা কমতে থাকে। এভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফর্সা চামড়া আর উঁচু জাত মানুষের মনে একসঙ্গে জোড়া লেগে গেল। ফর্সা চামড়া উঁচু মর্যাদার হয়েছিল সুন্দর বলে নয়; হয়েছিল কারণ যাঁরা ঘটনাক্রমে ফর্সা ছিলেন, তাঁরাই ঘটনাক্রমে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন।
তারপর এল ব্রিটিশরা আর তার ওপর চাপিয়ে দিল ইউরোপীয় বর্ণবাদ—ফর্সা শাসকই হয়ে উঠল কর্তৃত্ব আর সভ্যতার মুখ।
বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষই বাঙালি। আমরা প্রায় গোটাটাই এক জাতি। কাজেই এই গায়ের রঙের বৈষম্য ভিন্ন ভিন্ন জাতির মধ্যে নয়। এটি একই জনগোষ্ঠীর মানুষের নিজেদের মধ্যে, রঙের সামান্য তারতম্য নিয়ে একে অন্যকে মাপা—যে তারতম্যের একমাত্র কারণ, কারও কারও পূর্বপুরুষ কয়েক হাজার বছর একটু বেশি উত্তরে ছিলেন। এটুকুই। সংস্কৃতি না, সৌন্দর্য না। কেবল আপনার পূর্বপুরুষের গায়ে কতটুকু রোদ পড়েছিল।
একবার এটি বুঝে ফেললে গোটা মর্যাদাক্রমটাই ভেঙে পড়ে—উঁচু বর্ণ, নিচু বর্ণ বলে আদৌ কিছু নেই। আছে শুধু এমন চামড়া, যা তার অক্ষাংশের সঙ্গে খাপ খায়, আর এমন চামড়া, যা খায় না। তার ওপর জমে ওঠা বাকি সবকিছু—ক্রিম, প্রত্যাখ্যাত বিয়ের প্রস্তাব, আত্মীয়স্বজনের মন্তব্য—সবই বাইরে থেকে আমদানি করা: প্রথমে অভিবাসনের হাত ধরে, তারপর ব্রিটিশদের হাত ধরে আর শেষমেশ ফেয়ারনেস ক্রিম বেচা কোম্পানিগুলোর হাত ধরে।
যে চামড়া নিয়ে আপনাকে লজ্জা পেতে শেখানো হয়েছিল, সেই চামড়াই এই ভূখণ্ডের জন্য সবচেয়ে মানানসই; আর এটাই আপনার সবচেয়ে পুরোনো পরিচয়। এই চামড়াই ৫০ হাজার বছর ধরে এই বদ্বীপে আপনার মানুষদের বাঁচিয়ে রেখেছে। আর এই চামড়াই লাখ লাখ বছর আগে আফ্রিকার রোদের কড়া অতিবেগুনি রশ্মির সামনে ঢালের মতো গোটা মানবজাতির জিনগুলোকে আগলে রেখেছিল—যাতে আজ এই পৃথিবীতে মানুষ টিকে থাকতে পারে। কালো মানুষ, ফর্সা মানুষ—যেকোনো মানুষ।
গায়ের রং কোনো দিনই সমস্যা ছিল না। ছিল সমাধান।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট বাফেলো, যুক্তরাষ্ট্র
সূত্র: ১. Journal of Human Evolution, 2000; 39(1): 57–106. ২. Science, 1978; 201(4356): 625–626. ৩. Science, 2005; 310(5755): 1782–1786. ৪. Molecular Biology and Evolution, 2007; 24(3): 710–722. ৫. Nature, 2014; 507(7491): 225–228. ৬. Nature Ecology & Evolution, 2019; 3(5): 765–771. ৭. Nature, 2009; 461(7263): 489–494. ৮. American Journal of Human Genetics, 2013; 93(3): 422–438. ৯. Science, 2019; 365(6457): eaat7487.



