ইউরোপের প্রায় অর্ধেক তরুণ এখন তাদের ব্যক্তিগত ও আবেগীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত ইপসোস বিভিএ-এর এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে।
জরিপের ফলাফল
জরিপে অংশ নেওয়া ৩ হাজার ৮০০ জনের মধ্যে ৫১ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, চ্যাটবটের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে কথা বলা তাদের কাছে 'সহজ'। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের সঙ্গে কথা বলা সহজ মনে করেন ৪৯ শতাংশ এবং মনোবিদদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩৭ শতাংশ। তবে কাছের মানুষদের অবস্থান তালিকার শীর্ষে রয়েছে—৬৮ শতাংশ তরুণ বন্ধুদের সঙ্গে এবং ৬১ শতাংশ বাবা-মায়ের সঙ্গে আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
জরিপের পদ্ধতি
ফ্রান্সের গোপনীয়তা বিষয়ক নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএনআইএল এবং বিমাকারী প্রতিষ্ঠান গ্রুপ ভিওয়াইভি-র অর্থায়নে এই জরিপ পরিচালিত হয়। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন এবং আয়ারল্যান্ডের ১১ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের ওপর এই গবেষণা চালানো হয়।
মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা
জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ২৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সাধারণ উদ্বেগজনিত ব্যাধির লক্ষণ পাওয়া গেছে, যা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তার প্রকাশ। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশ আগে থেকেই এআই টুল ব্যবহার করেছেন। তাদের মতে, সব সময় পাওয়া যায় এবং কোনো বিচার-বিশ্লেষণ বা সমালোচনা করে না বলেই তারা এআই-এর দিকে ঝুঁকছেন। প্রতি পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের বেশি ব্যবহারকারী এআই-কে তাদের 'জীবন উপদেষ্টা' বা 'বিশ্বস্ত বন্ধু' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের আবেগ শনাক্ত করা এবং নিরাপদে আবেগীয় সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে এআই-এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ফ্লোরিডার এক ব্যক্তির পরিবার গুগলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, গুগলের 'জেমিনি' এআই চ্যাটবট ওই ব্যক্তির মানসিক বিভ্রান্তি বাড়িয়ে দিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়।
স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গবেষক ও মনোবিদ লুডউইগ ফ্রাঙ্ক ফয়েন রয়টার্সকে বলেন, বর্তমানের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো উচ্চমানের উত্তর দিতে সক্ষম। এমনকি পেশাদার চিকিৎসকদের পক্ষেও অনেক সময় মানুষের দেওয়া পরামর্শ এবং এআই-এর পরামর্শের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে কেবল চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ফয়েন। তিনি বলেন, এআই সিস্টেমগুলো মূলত ব্যবহারকারীকে ব্যস্ত রাখার জন্য তৈরি করা হয়, যা সব সময় মানসিক স্বাস্থ্য সেবার লক্ষ্যের সঙ্গে মেলে না। ফয়েন আরও যোগ করেন, 'এআই তথ্য ও সমর্থন দিতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই মানবিক সম্পর্ক বা পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না। যদি কেউ বাবা-মা বা বন্ধুর বদলে চ্যাটবটের কাছে যায়, তবে সেটি উদ্বেগের বিষয়। প্রযুক্তি মানুষকে যেন আরও একা করে না দেয়, সেটিই আমাদের নিশ্চিত করতে হবে'।



