বাংলাদেশের মতো বন্যাপ্রবণ দেশে নদীর পানির উচ্চতার আগাম ও নির্ভুলভাবে জানানো দীর্ঘদিনের এক বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে পর্যাপ্ত তথ্য বা উপাত্তের অভাব রয়েছে, সেখানে এই সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমন বাস্তবতায় একটি অত্যন্ত কার্যকর পূর্বাভাস মডেল তৈরি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট বন্যা মোকাবিলা এবং তথ্য সংকটপূর্ণ এলাকায় কার্যকরভাবে বন্যার সতর্কবার্তা দিতেই এই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে।
গবেষণার নেতৃত্ব ও অর্থায়ন
গবেষণার মূল নেতৃত্বে ছিলেন বাকৃবির সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল ইসলাম। গবেষক দলে আরও ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আদহামসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা। গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএসটি) এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস) প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করেছে।
গবেষণার পদ্ধতি ও তথ্য বিশ্লেষণ
গবেষণাটির কাজ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়। দীর্ঘ ২৬ বছরের অর্থাৎ ১৯৯৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আবহাওয়ার তথ্য ও নদ-নদীর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই শক্তিশালী মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। গবেষণাটি ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক জার্নালে কিউ১-কিউ২ ক্যাটাগরিতে প্রকাশিত হয়। গবেষণার মূল উদ্ভাবন হলো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদীর পানির উচ্চতা সম্পর্কে আগাম ধারণা দেওয়া। গবেষকরা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন ইসলামপুর, সরিষাবাড়ী, দেওয়ানগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বেশ কয়েকটি ভিন্ন এআই মডেলের মাধ্যমে পরীক্ষা চালিয়েছেন।
মডেলের কার্যকারিতা
গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, নদীর পানির উচ্চতা এবং পানি প্রবাহের হারের মতো আবহাওয়া সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করে নদীর পানি কত বাড়বে বা কমবে তা আগাম জানানো। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় নতুন প্রযুক্তি অনেক কম তথ্য ব্যবহার করে নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছে। বাকৃবির সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল ইসলাম গবেষণার ফলাফল নিয়ে জানান, যখন অতীতের পানির উচ্চতার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, তখন র্যান্ডম ফরেস্ট (আরএফএম) মডেলটি ৯৯.১৬ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুল ফলাফল দিয়েছে। অন্যদিকে যেসব এলাকায় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে কেবল বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিপ লার্নিং মডেল (এলএসটিএম) ৮১.৪৫ শতাংশ পর্যন্ত সঠিক পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া গবেষণায় এসভিএম মডেলটিও ব্যবহৃত হয়েছে। তথ্যের স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের নির্ভুলতা ডেটা সংকটপূর্ণ এলাকায় বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কৃষকদের জন্য সুফল
তিনি বলেন, ‘এই প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা হলে দেশের কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হবেন। বন্যার সঠিক আগাম পূর্বাভাস পেলে কৃষকরা আগেভাগেই তাদের পাকা ধান বা অন্যান্য ফসল ঘরে তুলতে পারবেন। এ ছাড়া গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরানো এবং সেচ পরিকল্পনায় পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে কৃষকের সম্ভাব্য বড় আর্থিক ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’ গবেষকদের লক্ষ্য হলো এই মডেলটিকে দেশের বিভিন্ন নদীতে প্রয়োগ করা এবং একটি কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরি করা। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় তৈরি এই মডেল অন্য এলাকাতেও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ড. মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, এই উদ্ভাবন বর্তমানে একটি কার্যকর অপারেশনাল ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে প্রস্তুত আছে, যা দেশের জাতীয় নদী নেটওয়ার্কের পূর্বাভাস কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা সম্ভব। এটি কোনও নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক পণ্য নয়, বরং একটি ডিজিটাল বা সফটওয়্যার ভিত্তিক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। ফলে এটি ব্যবহারের জন্য কৃষকদের বাড়তি কোনও টাকা খরচ করতে হবে না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কারিগরি সহায়তা পেলে এই এআইভিত্তিক প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে একটি পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল সিস্টেমে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। তা সহজেই মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ করা যাবে। সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে এটি অ্যাপ বা মোবাইল বার্তার আকারে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।



