একটি মহানগরের নাগরিকদের সভ্যবোধ পরিমাপের বহু উপায় আছে। এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম মানদণ্ড হলো—সেই মহানগরের মানুষ ট্রাফিক আইন কতখানি মানে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় ট্রাফিক সিগন্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন মোড়ে স্থাপিত এই ক্যামেরাগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলক চালুর পর অল্প কয়েক সপ্তাহেই শত শত যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষত বাসের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা সর্বাধিক।
আচরণ পরিবর্তনের প্রচেষ্টা
এই উদ্যোগকে শুধু প্রযুক্তির প্রয়োগ বললে ভুল হবে। এটি মূলত মানুষের আচরণ পরিবর্তনের একটি প্রচেষ্টা। কারণ ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি এড়ানো সম্ভব হলেও সর্বক্ষণ জাগ্রত একটি যান্ত্রিক চোখকে ফাঁকি দেওয়া কঠিন। দেখা গেছে, ক্যামেরা স্থাপনের পর অনেক চালক জেব্রা ক্রসিংয়ের আগেই গাড়ি থামাতে শুরু করেছেন এবং সিগন্যাল মানার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ব্যবহার
বিশ্বের বহু শহর ইতিমধ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। সিঙ্গাপুরের স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, লন্ডনের এএনপিআর (অটোমেটিক নাম্বার প্লেট রিকগনিশন), দুবাইয়ের এআই-নিয়ন্ত্রিত সড়ক পর্যবেক্ষণ, নিউ ইয়র্কের রেড-লাইট ক্যামেরা, সাংহাই ও বেইজিংয়ের বুদ্ধিমান ট্রাফিক নেটওয়ার্ক—সবখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যানবাহনের গতি, সিগন্যাল অমান্য, অবৈধ পার্কিং এবং নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি দুর্ঘটনা কমাতে এবং যান চলাচলের দক্ষতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
তথ্যভান্ডারের নির্ভুলতা
তবে প্রযুক্তির সাফল্যের পিছনে কেবল যন্ত্রের ক্ষমতা নয়, তথ্যভান্ডারের নির্ভুলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার ক্ষেত্রেও ক্যামেরা নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে বিআরটিএর তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে অপরাধীর পরিচয় নির্ধারণ করছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি তখনই কার্যকর, যখন প্রশাসনিক তথ্যব্যবস্থা সঠিক ও হালনাগাদ থাকে।
সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ
কিন্তু যে কোনো প্রযুক্তির মতো এরও সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমত, এআই ক্যামেরা সব সময় শতভাগ নির্ভুল নয়। আবহাওয়া, আলোর স্বল্পতা, নম্বরপ্লেটের অস্পষ্টতা কিংবা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ভুল শনাক্তকরণ ঘটতে পারে। দ্বিতীয়ত, যন্ত্র নিয়ম ভাঙা ধরতে পারে, কিন্তু নিয়ম ভাঙার কারণ বুঝতে পারে না। কোনো চালক জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে ক্যামেরা তার প্রেক্ষাপট বিবেচনা করবে না। ফলে মানবিক বিচারের প্রয়োজন কখনোই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় না।
গোপনীয়তা ও অপব্যবহারের ঝুঁকি
আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। শহরের সর্বত্র ক্যামেরা বসানো মানে নাগরিকের চলাফেরা সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা। গণতান্ত্রিক সমাজে এই তথ্যের ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকলে অপব্যবহারের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে। উন্নত দেশগুলিও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। তদুপরি, প্রযুক্তি নতুন ধরনের অপরাধেরও জন্ম দেয়। ঢাকায় ইতিমধ্যে এআই জরিমানার নামে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। আবার কোনো কোনো ব্যক্তি নম্বরপ্লেট আংশিক ঢেকে ক্যামেরাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে।
আইন প্রয়োগে প্রক্রিয়া-নির্ভরতা
তবে সামগ্রিক বিচারে এআই ক্যামেরার সবচেয়ে বড় অবদান হলো—এটি আইন প্রয়োগকে ব্যক্তিনির্ভরতা থেকে প্রক্রিয়া-নির্ভরতার দিকে নিয়ে যায়। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, সরকারি গাড়ি কিংবা সাধারণ নাগরিক—সকলের জন্য একই নিয়ম কার্যকর হওয়া সম্ভব হয়। আমাদের এ-ও মনে রাখতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনোই নাগরিক দায়িত্ববোধের বিকল্প নয়। ক্যামেরা মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে, কিন্তু মানুষকে বিবেকবান করতে পারে না। শৃঙ্খলা যদি কেবল জরিমানার ভয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে ক্যামেরা সরিয়ে গেলে সেই শৃঙ্খলাও বিলুপ্ত হবে। কিন্তু যদি প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে নিয়ম মানার সংস্কৃতি গঠনে সহায়ক হয়, তবে তার প্রকৃত সাফল্য সেখানেই।
উপসংহার
অতএব, এআই ক্যামেরা আসলে কোনো জাদুকাঠি নয়। এটি এক প্রকার আয়না, যা আমাদের সড়ক-সংস্কৃতির প্রকৃত চেহারা দেখিয়ে দেয়। প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আমাদের নাগরিক চরিত্রের। যন্ত্রের চোখ যতই তীক্ষ্ণ হোক, একটি সভ্য নগর গড়ার জন্য মানুষের বিবেকের চোখকেই শেষ পর্যন্ত জাগ্রত হতে হবে।



