বজ্রপাতের আলো কেন জিগজ্যাগ হয়? বিজ্ঞান কী বলে
বজ্রপাতের আলো কেন জিগজ্যাগ হয়? বিজ্ঞান কী বলে

বজ্রপাত দেখার সময় অনেকেই আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। মনে হয়, একটা সাদা আগুনের রেখা আকাশ চিরে নিচে নেমে আসছে—আর সেটার পথ একদম সোজা নয়, বরং ভাঙা ভাঙা, আঁকাবাঁকা, যেন কেউ কলম দিয়ে কাঁপা হাতে রেখা এঁকেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আলো তো সরলপথে চলে, তাহলে বজ্রপাতের আলো এমন জিগজ্যাগ কেন?

আলো আসলে কীভাবে চলে?

বিজ্ঞানের একটি সহজ নিয়ম আছে—আলো সমজাতীয় (একই ধরনের) মাধ্যমে সরলরেখায় চলে। অর্থাৎ যদি চারপাশের বাতাস বা মাধ্যম একরকম থাকে, তাহলে আলো বাঁকবে না। সে সোজা যাবে, ঠিক যেন লেজার বিম। কিন্তু পৃথিবীর বাস্তব পরিবেশ কখনোই পুরোপুরি একরকম নয়। বিশেষ করে বজ্রপাতের সময় তো একেবারেই নয়।

বজ্রপাত একটানা সোজা লাইন নয়

আমরা দূর থেকে মনে করি বজ্রপাত যেন আকাশ থেকে একটানে নেমে আসে। কিন্তু বাস্তবে বজ্রপাত তৈরি হয় অনেকগুলো ছোট ছোট ধাপে ধাপে বৈদ্যুতিক স্রোতের মাধ্যমে। আকাশের ভেতরে মেঘে যখন প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক চার্জ জমে যায়, তখন তা পৃথিবীর দিকে নামার জন্য পথ খোঁজে। কিন্তু এই পথ খোলা রাস্তার মতো নয়—এটা অনেকটা জটিল, বাধায় ভরা একটি গোলকধাঁধা। বাতাসের ভেতরে থাকে—তাপমাত্রার পার্থক্য, আর্দ্রতার পরিবর্তন, ঘনত্বের ওঠানামা ও আয়নিত গ্যাসের এলাকা। এই সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ একদম সোজা পথে যেতে পারে না। তাই সে সবচেয়ে সহজ পথে যেতে গিয়ে বারবার দিক বদলায়। ফলে বজ্রপাতের পথটা হয় ভাঙা ভাঙা, হঠাৎ বাঁক নেওয়া একধরনের জিগজ্যাগ লাইন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তাহলে আলো কেন বাঁকা মনে হয়?

এখানেই আসে আসল মজার অংশ। আমরা যেটা দেখি, সেটা শুধু বিদ্যুতের পথ নয়—সেটার তৈরি করা আলো। বজ্রপাতের সময় বাতাসের ভেতর দিয়ে প্রচণ্ড তাপ ও শক্তি ছড়িয়ে পড়ে। এই তাপ বাতাসকে এক জায়গায় বেশি গরম করে, আর অন্য জায়গায় কম। ফলে বাতাসের ঘনত্ব সব জায়গায় সমান থাকে না। যখন আলো এই অসম ঘনত্বের বাতাসের মধ্য দিয়ে যায়, তখন সে সামান্য দিক পরিবর্তন করে। এই ঘটনাকে বলে প্রতিসরণ (refraction)। সহজভাবে বললে, আলো যেন ভিন্ন ভিন্ন ঘনত্বের বাতাসের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে একটু একটু করে বাঁক নেয়।

কিন্তু আসল কারণ শুধু এটা নয়

বজ্রপাতের আঁকাবাঁকা দেখার পেছনে আরও একটা বড় কারণ আছে—আমাদের চোখ। বজ্রপাত ঘটে খুবই দ্রুত, প্রায় চোখের পলকের থেকেও কম সময়ে। এত দ্রুত ঘটনার প্রতিটি অংশ আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়। আমাদের চোখ এবং মস্তিষ্ক পুরো ঘটনাটাকে একসঙ্গে একটা ছবি হিসেবে ধরে নেয়। ফলে আমরা দেখতে পাই পুরো বজ্রপাতের পথ—যেটা আসলে অনেক ছোট ছোট ধাপে তৈরি হয়েছে।

বজ্রপাতের ভেতরের ধাপে ধাপে যাত্রা

বজ্রপাত শুরু হয় আকাশে ছোট একটি বৈদ্যুতিক স্রোত দিয়ে, যাকে বলা যায় ‘পাইলট চ্যানেল’। এটা ধীরে ধীরে নিচের দিকে আসে। একই সময়ে পৃথিবী থেকে কিছু চার্জ ওপরের দিকে উঠে আসে। যখন এই দুটি মিলিত হয়, তখনই তৈরি হয় সেই ভয়ংকর উজ্জ্বল বজ্রপাত। এই পুরো প্রক্রিয়াটা একেবারে সোজা লাইনে ঘটে না। বরং এটা অনেকটা এমন— একটু এগোনো, থামা, আবার দিক বদলানো, আবার এগোনো। ফলে শেষ পর্যন্ত যে পথ তৈরি হয়, সেটা হয় জিগজ্যাগ।

তাহলে কি আলো সব সময় সরলপথে চলে?

না, সব সময় নয়। আলো সরলপথে চলতে ভালোবাসে, কিন্তু বাস্তব পৃথিবী তাকে অনেক সময় বাঁকাতে বাধ্য করে। যেমন কাচে গেলে আলো বেঁকে যায়, পানিতে গেলে দিক বদলায়, মরুভূমির গরম বাতাসে মরীচিকা তৈরি হয়। অর্থাৎ আলো ‘নিয়ম মেনে চলে’, কিন্তু পরিবেশ তাকে সেই নিয়মে চলতে দেয় না।

বজ্রপাত কেন এত ভয়ংকর লাগে?

বজ্রপাত শুধু আলো নয়, সঙ্গে থাকে প্রচণ্ড শব্দও—গর্জন। কারণ, বজ্রপাতের সময় বাতাস হঠাৎ করে খুব দ্রুত গরম হয়ে প্রসারিত হয়। এই বিস্ফোরণের মতো প্রসারণই শব্দ তৈরি করে। তাই আমরা আলো দেখি আগে, শব্দ শুনি পরে—কারণ, আলো শব্দের চেয়ে অনেক দ্রুত চলে। বজ্রপাতের সময় সাবধানে ঘরের ভেতরে থেকো।