তালেবানের সরকারের নিষেধাজ্ঞার পর স্মার্টফোন ভেঙে ফেলার ভিডিওর একটি দৃশ্যছবি: দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট। সরকারি কর্মকর্তাদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ পরবর্তী সময়ে সাধারণ জনগণের ওপরও একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের পূর্বাভাস হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত
তালেবানের সামরিক আদালতের জারি করা এক নির্দেশনায় দেখা গেছে, চলতি সপ্তাহ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। এতে ‘উচ্চপদস্থ, নিম্নপদস্থ, সাধারণ মুজাহিদ কিংবা সরকারি কর্মী’—সবার জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ নির্দেশনার একটি অনুলিপি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের হাতে এসেছে। অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এক তালেবান কর্মকর্তা নিজের ফোন থেকে এই নিষেধাজ্ঞার আদেশ পড়ে শোনাচ্ছেন; আর অন্য একজন স্মার্টফোন ভেঙে ফেলছেন।
আদেশে বলা হয়েছে, ‘যদি কেউ এটি (স্মার্টফোন) ব্যবহার করে, তবে তাঁর ফোনটি ভেঙে ফেলা হবে। আইনভঙ্গকারীর ওপর আইনি ও শরিয়া মোতাবেক শাস্তি প্রয়োগ করা হবে।’ নির্দেশনায় আরও বলা হয়, কোনো ধরনের ছাড়ের জন্য তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার লিখিত ডিক্রি বা আদেশের প্রয়োজন হবে। তবে এ নির্দেশনা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে দ্য গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে তালেবানের কোনো মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বাস্তবায়নের বিভিন্নতা
আফগানিস্তানের বিভিন্ন সূত্র ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে কার্যকর হচ্ছে। কোথাও শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো এলাকায় এর আওতা বাড়িয়ে নারী, সাধারণ মানুষ, স্বাস্থ্যকর্মী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও তা প্রয়োগ করা হচ্ছে।
অনলাইনে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এক তালেবান কর্মকর্তা নিজের ফোন থেকে এই নিষেধাজ্ঞার আদেশ পড়ে শোনাচ্ছেন; আর অন্য একজন স্মার্টফোন ভেঙে ফেলছেন।
আফগানিস্তান নিয়ে কাজ করেন এমন একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে অনেক কিছু ঘটে। কারণ, স্থানীয় কেউ হয়তো এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ কোনো নিষেধাজ্ঞার প্রাথমিক পদক্ষেপও হতে পারে এবং তারা হয়তো পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে।’
ইন্টারনেট বন্ধের পূর্ব অভিজ্ঞতা
এর আগে তালেবান সরকার আফগানিস্তানকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে। গত সেপ্টেম্বরে পর্নোগ্রাফি নিয়ে উদ্বেগের অস্পষ্ট অজুহাতে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট সেবা বন্ধের নির্দেশ দিলে দুই দিন তা বন্ধ ছিল। সে সময় জারি করা এক আদেশে বলা হয়েছিল, ‘অনৈতিকতা রোধে’ এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আফগানিস্তানবিষয়ক ওই বিশ্লেষক জানান, ইন্টারনেট বন্ধের সেই সিদ্ধান্তটি তাড়াহুড়া করে নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি এতে দূরদর্শিতার অভাব ছিল। এই সিদ্ধান্ত সারা দেশে ব্যবসাবাণিজ্য স্থবির করে দিয়েছিল এবং জরুরি সেবা ও উড়োজাহাজ চলাচলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘ওই সময় বেসরকারি খাত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল, ব্যাংকিং খাতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি তাদের (তালেবানের) নিজস্ব লোক, তথা নিরাপত্তা বিভাগ ও সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ও বুঝতে পেরেছিল। পরে তাঁরা বলেছিলেন, “আমরা বিষয়টি নিয়ে আসলে গভীরভাবে ভাবিনি।” তাই তাঁরাই আবার ইন্টারনেট চালু করে দিয়েছিলেন।’
নিষেধাজ্ঞার পেছনের কারণ
স্মার্টফোন নিষিদ্ধের নেপথ্যে এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে সম্ভবত বেশ কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। প্রথমত, যথাযথভাবে হিজাব না পরার অভিযোগে সম্প্রতি তালেবান কর্তৃক নারী ও মেয়েদের গ্রেপ্তার শুরু করার প্রতিবাদে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর হেরাতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। ধারণা করা হয়, বিক্ষোভের এক পর্যায়ে তালেবান সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভিড় লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। এতে অন্তত দুজন নিহত হন। এ ঘটনা স্মার্টফোনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পেছনে কিছুটা প্রভাব রাখতে পারে বলে মনে করেন ওই বিশ্লেষক।
তাঁর ভাষ্যমতে, ‘হেরাতের বিক্ষোভের যে ভিডিওগুলো সামনে এসেছে, তা নানা ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে; কিন্তু প্রশাসন এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করেছিল। শুরুতে তাঁরা অস্বীকার করে বলেছিলেন, না না, এমন কিছু ঘটেনি; কিন্তু এরপর ভিডিওগুলো বের হতে শুরু করে।’
তবে হেরাতের ওই বিক্ষোভের আগে থেকেই তালেবান সরকার স্মার্টফোন নিষিদ্ধের বিষয়ে জোর দিচ্ছিল। এর পক্ষে প্রধান যুক্তি ছিল—অভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁস রোধ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের গতি কমে যাওয়ার উদ্বেগ।
কর্মচারীদের অভিজ্ঞতা
হেরাত প্রদেশের দুজন সরকারি কর্মচারী জানান, সেখানে কয়েক মাস ধরে স্মার্টফোনের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। তাঁদের একজন বলেন, ‘প্রায় দুই মাস আগে অফিসে স্মার্টফোন না আনতে বলা হয়েছিল। আমি ও কয়েকজন সহকর্মী বিষয়টি গুরুত্ব দিইনি। পরে তাঁরা ফোনগুলো জব্দ করেন। আমরা এ নিয়ে হইচই করলে তাঁরা (কর্মকর্তারা) আমাদের ফোনগুলো ভেঙে ফেলেন।’ ফোন ভেঙে ফেলায় তাঁর আনুমানিক ৮ হাজার আফগানি (৯৫ পাউন্ড) ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকের মতামত
বিশ্লেষকের মতে, তালেবান মনে করে, মানুষ সব সময় ফোন নিয়ে পড়ে থাকে, কাজ করে না। তাই তাদের দৃষ্টিতে কর্মক্ষেত্রে স্মার্টফোনের কোনো জায়গা নেই। তথ্য ফাঁসের আশঙ্কার বিষয়টি অমূলক নয়। গার্ডিয়ানকে ওই বিশ্লেষক জানান, এমন ঘটনা অনেক ঘটছে। কারণ, সরকারি কর্মকর্তারা নথিপত্রের ছবি তুলতে এবং বৈঠকের রেকর্ড রাখতে মাঝেমধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন; কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নেতার চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই কোনো না কোনোভাবে তা জনগণের সামনে চলে এসেছে।
অনলাইনে কর্মীদের সময় নষ্ট করা ও তথ্য ফাঁস যেকোনো সরকারের জন্য একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ। তবে ওই বিশ্লেষকের মতে, তালেবান সরকার এ সমস্যা যেভাবে সমাধান করতে চাইছে, সেই দৃষ্টিভঙ্গি সমস্যাজনক। এই বিশ্লেষক বলেন, ‘স্মার্টফোন ও অনলাইনে থাকলে কাজ একপর্যায়ে কিছুটা হলেও কমে আসে। এটি বিশ্বজনীন সমস্যা। তফাতটা হলো অন্য কোনো দেশকে আমি এর বিরুদ্ধে এভাবে আইন প্রণয়ন করতে দেখিনি।’



