এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১: নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
গত বছর ১২ জুন ভারতের আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করা এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১৭১-এর ২৪২ জন যাত্রীর জন্য পরিসংখ্যান হয়তো স্বস্তিদায়ক ছিল। তারা যে উড়োজাহাজটিতে চড়েছিলেন, সেটি ছিল বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার, যা ২০১১ সালে পরিষেবা শুরু করার পর থেকে তখন পর্যন্ত কোনও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার শিকার হয়নি। বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ১০০-এর বেশি ড্রিমলাইনার বর্তমানে আকাশে উড়ছে এবং বোয়িংয়ের তথ্যমতে, গত এক দশকে এগুলো ৮৭ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি যাত্রী বহন করেছে। এয়ার ইন্ডিয়ার এই নির্দিষ্ট ৭৮৭ বিমানটি ২০১৪ সালে সরবরাহ করা হয়েছিল, যা ৪১ হাজার ঘণ্টা উড্ডয়নকাল এবং ৮ হাজার বার সফলভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ সম্পন্ন করেছিল।
কিন্তু এসব পরিসংখ্যানের কোনোটিই শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের বাঁচাতে পারেনি। আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের ঠিক পরেই, যখন বিমানটি মাটি থেকে মাত্র ৬২৫ ফুট উচ্চতায় ছিল, তখন এটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উচ্চতা হারাতে শুরু করে এবং একটি আবাসিক এলাকায় আছড়ে পড়ে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় একজন বাদে চালক ও যাত্রীসহ বিমানের সবাই নিহত হন।
বোয়িংয়ের প্রতিক্রিয়া
বোয়িংয়ের প্রেসিডেন্ট ও সিইও কেলি অর্টবার্গ এক বিবৃতিতে তখন বলেছিলেন, “এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১৭১-এর যাত্রী ও ক্রু সদস্য এবং আহমেদাবাদে এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সবার পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। আমি এয়ার ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান এন. চন্দ্রশেখরনের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আমাদের পূর্ণ সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছি। ভারতের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরোর (এএআইবি) নেতৃত্বে পরিচালিত তদন্তে সহায়তার জন্য বোয়িংয়ের একটি দল প্রস্তুত রয়েছে।” তদন্তকারীরা কেবল ফ্লাইট ১৭১-এর যান্ত্রিক ত্রুটিই নয়, বরং গত ১৪ বছর ধরে ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের নিরাপত্তা নিয়ে ওঠা অসংখ্য অভিযোগ, তথ্য ফাঁসকারীদের রিপোর্ট এবং বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটির ইতিহাসও নতুন করে খতিয়ে দেখছেন।
ড্রিমলাইনারের সমস্যার ইতিহাস
ড্রিমলাইনারের সমস্যার শুরু ২০১৩ সালের শুরুতে। সে সময় জাপানি এয়ারলাইন্সের দুটি বিমানে আগুনের ঘটনা ঘটে। একটি বোস্টনের লোগান বিমানবন্দরে অবতরণ করেছিল, অন্যটি জাপান থেকে ওড়ার পরপরই ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিমানের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে আগুন লেগেছিল। মার্কিন ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ড্রিমলাইনারের চলাচল বন্ধ করে দেয় এবং নতুন সরবরাহ স্থগিত করে। পরে বোয়িং ব্যাটারির উন্নত ইনসুলেশন এবং স্টেইনলেস স্টিলের বক্স ব্যবহারের সমাধান দিলে এফএএ সেটিকে ছাড়পত্র দেয়।
তথ্য ফাঁসকারীদের অভিযোগ
২০১৯ সালে বোয়িংয়ের গুণমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপক জন বারনেট এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিমানের ফ্লাইট কন্ট্রোল সিস্টেমের তারের সংযোগস্থলে অত্যন্ত অবহেলা করা হয়েছে। নাট-বল্টু টাইট করার সময় সেখানে ধাতব গুঁড়ো ফেলে রাখা হয়েছে, যা তারের ইনসুলেশন ছিদ্র করে ‘সর্বনাশা’ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বারনেট আরও অভিযোগ করেন, বিমানে ত্রুটিপূর্ণ বা নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছিল। এফএএ তদন্ত করে বারনেটের করা অভিযোগের সত্যতা পায় এবং সরবরাহ করার আগে বোয়িংকে এগুলো সংশোধনের নির্দেশ দেয়।
বারনেট অবসর গ্রহণের পর বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে সাউথ ক্যারোলিনায় মামলার কাজ চলাকালীন নিজের ট্রাকের ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। চিকিৎসকরা এটিকে আত্মহত্যা বললেও বারনেটের পরিবার দাবি করেছে, ‘বোয়িং হয়তো ট্রিগার টেপেনি, কিন্তু তাদের আচরণই ছিল বারনেটের এই চরম সিদ্ধান্তের মূল কারণ।’
নির্মাণগত ত্রুটি ও টারজান ইফেক্ট
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে স্যাম সালেহপুর নামে বোয়িংয়ের আরেক প্রকৌশলী বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন। তিনি দাবি করেন, ড্রিমলাইনারের ফিউজলেজ বা মূল কাঠামোর অংশগুলো সঠিকভাবে সংযোগ করা হয়নি। কাঠামোর অংশগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে মিলছিল না, তখন কর্মীরা গায়ের জোর খাটিয়ে সেগুলো মেলাচ্ছিলেন। সালেহপুর ক্যাপিটল হিলে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলেছিলেন, “আমি নিজের চোখে মানুষকে বিমানের অংশগুলোর ওপর লাফালাফি করতে দেখেছি যাতে ছিদ্রগুলো সাময়িকভাবে একে অপরের সমান্তরালে আসে। আমি একে ‘টারজান ইফেক্ট’ নাম দিয়েছিলাম।” এই ফাঁকগুলোর কারণে উড্ডয়নকালে বিমানটি মাঝ আকাশে ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এফএএ-র নির্দেশনা ও সাম্প্রতিক ঘটনা
মে মাসে এফএএ আবারও বোয়িংকে নির্দেশ দেয় নির্মাণাধীন সব ৭৮৭ বিমান পুনরায় পরীক্ষা করার জন্য এবং পরিষেবাতে থাকা বিমানগুলোর জন্য একটি জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করতে। ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় এই ত্রুটির কারণেই ড্রিমলাইনার সরবরাহ বন্ধ ছিল।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে ল্যাটাম এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট সিডনি থেকে অকল্যান্ড যাওয়ার সময় হঠাৎ ৪০০ ফুট নিচে পড়ে যায়। পরে জানা যায়, পাইলটের আসনটি অপ্রত্যাশিতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কারণে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন। চালক পরে নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করলেও ১০ জন যাত্রী ও ৩ জন ক্রু আহত হন।
সূত্র: টাইম



