আদানি-সাগরের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সব অভিযোগ স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার
আদানি-সাগরের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ প্রত্যাহার

ভারতের শীর্ষস্থানীয় ধনকুবের ও আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি এবং তার ভাতিজা সাগর আদানির বিরুদ্ধে আনা জালিয়াতি ও দুর্নীতির সব ফৌজদারি অভিযোগ স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে)। এর মাধ্যমে নিউইয়র্কের একটি আদালতে দীর্ঘদিন ধরে চলা বহুল আলোচিত সিকিউরিটিজ ও ওয়্যার ফ্রড মামলাটির সম্পূর্ণ ও স্থায়ী অবসান ঘটল।

মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া

সোমবার (১৮ মে) মার্কিন প্রসিকিউটররা আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতকে জানান যে তারা এই অভিযোগগুলো টিকিয়ে রাখার মতো পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পাননি। এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ফলে গত কয়েক দিন ধরে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলা একাধিক আইনি ও নিয়ন্ত্রণমূলক তদন্তের প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। নিউইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের একটি আদালতে মার্কিন বিচার বিভাগ আদানির বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগপত্রটি প্রত্যাহারের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানায়। আবেদনে বিচার বিভাগ উল্লেখ করেছে যে তারা মামলাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে এবং তাদের প্রসিকিউটোরিয়াল বিবেচনার ভিত্তিতে এই ব্যক্তিগত আসামিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগের পেছনে আর বাড়তি সম্পদ বা সময় ব্যয় না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

স্থায়ী খারিজের আদেশ

মার্কিন প্রসিকিউটরদের এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলাটি ‘উইথ প্রেজুডিস’ বা স্থায়ীভাবে খারিজের আদেশ দেন, যার অর্থ হলো ভবিষ্যতে মার্কিন প্রশাসন এই একই ঘটনার পরিপ্রক্ষিতে আদানির বিরুদ্ধে নতুন করে আর কোনো মামলা বা তদন্ত শুরু করতে পারবে না। এর আগে গত সপ্তাহে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ভারতের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য গোপনের দেওয়ানি অভিযোগটি একটি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে। আদালতের নথিতে দেখা গেছে, কোনো ধরনের অপরাধ স্বীকার বা অস্বীকার না করেই এই দেওয়ানি মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে গৌতম আদানি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার এবং সাগর আদানি ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে সম্মত হন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যান্য অভিযোগের নিষ্পত্তি

এর পরপরই ইরানের কাছ থেকে এলপিজি আমদানির মাধ্যমে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের একটি অভিযোগ আদানির পক্ষ থেকে ২৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার পরিশোধ এবং তদন্তে ‘স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ও ব্যাপক সহযোগিতা’ করার আশ্বাসের ভিত্তিতে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ওএফএসি (অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল) স্থায়ীভাবে নিষ্পত্তি করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় এই ধরনের পূর্ণাঙ্গ মামলা খারিজের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্কিন প্রসিকিউটররা যখন গভীর পর্যালোচনা শেষে দেখতে পান যে এই পুরো ঘটনার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি কোনো সংযোগ নেই এবং অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ তাদের হাতে নেই, তখনই মামলাটি আদানির পক্ষে চলে যায়।

মামলার পটভূমি

২০২৪ সালের শেষের দিকে এসইসি এবং ডিওজে এই মামলাটি দায়ের করেছিল। যেখানে অভিযোগ করা হয়েছিল যে আদানিরা ভারতে সৌরবিদ্যুৎ চুক্তি পাওয়ার জন্য ভারতীয় কর্মকর্তাদের প্রায় ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার ঘুষ দেওয়ার একটি গোপন পরিকল্পনা করেছিলেন এবং মার্কিন বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতাদের কাছ থেকে মূলধন তোলার সময় এই তথ্যটি সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিলেন। আদানিদের পক্ষে নিযুক্ত আমেরিকার পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সাল্লিভান অ্যান্ড ক্রমওয়েল, নিক্সন পিবডি, হেকার ফিঙ্ক, নর্টন রোজ ফুলব্রাইট এবং ব্রেসওয়েলের দক্ষ আইনজীবীরা গত ৭ এপ্রিল মার্কিন আদালতে একটি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন।

আইনজীবীদের যুক্তি

তারা দাবি করেন, এসইসির এই জালিয়াতি মামলাটি মার্কিন সিকিউরিটিজ আইনের বহির্ভূত বা একপাক্ষিক প্রয়োগ। কারণ মামলার আসামিরা ভারতীয় নাগরিক, বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানটি ভারতীয় এবং কথিত ঘটনাটি সম্পূর্ণভাবে ভারতের মাটিতে ঘটেছে, যার কোনো বন্ড মার্কিন শেয়ারবাজারে লেনদেন হয় না। ডিফেন্স টিম আরও প্রমাণ করে যে এই বন্ডের কারণে মার্কিন কোনো বিনিয়োগকারীর আর্থিক ক্ষতি হয়নি এবং বন্ডের সমস্ত দায় যথাসময়ে পরিশোধ করা হয়েছে, যার ফলে মার্কিন আদালতের এই মামলার ওপর কোনো আইনি এখতিয়ারই ছিল না। শুরু থেকেই আদানি গ্রুপ এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল এবং তাদের করপোরেট সুশাসন ও নিয়মতান্ত্রিকতার মানদণ্ড বজায় রাখার বিষয়ে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আইনি বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মার্কিন প্রশাসনের এই মামলা দায়েরের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে ভারতের মাটিতে ঘটে যাওয়া একটি কথিত এবং অপ্রমাণিত ঘুষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে সিকিউরিটিজ জালিয়াতির মামলা সাজানোর চেষ্টা করেছিল, তা ছিল মার্কিন আইনের একটি অযৌক্তিক ও জোরপূর্বক প্রসার মাত্র। শেষ পর্যন্ত মার্কিন বিচার বিভাগের এই স্থায়ী মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আদানি গ্রুপের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের পথে থাকা সমস্ত বড় আইনি বাধা কেটে গেল।