টেলিগ্রামে প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্য গ্রেপ্তার, উদ্ধার দেড় লাখ নগ্ন ছবি
টেলিগ্রামে প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্য গ্রেপ্তার

টেলিগ্রাম অ্যাপকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক ভয়ংকর প্রতারক চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)-৮। দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও হাতিয়ে নিয়ে টেলিগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রয় ও ব্ল্যাকমেল করত এই চক্র। ২৬ এপ্রিল দিবাগত রাতে ভোলা জেলায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে প্রায় দেড় লাখ নগ্ন ও স্পর্শকাতর ছবি-ভিডিও এবং কয়েক শ প্রিমিয়াম চ্যানেলের সন্ধান পাওয়া গেছে।

প্রথম আলোয় গত ২৬ মার্চ প্রকাশিত ‘টেলিগ্রাম অ্যাপের অন্ধকার ও সাইবার ব্ল্যাকমেল’ শিরোনামের সংবাদ প্রকাশের পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ব্ল্যাকমেল চেইনের ওপর নজরদারি করে তাঁদের আটক করা হয়। এ বিষয়ে গত সোমবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে র‍্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী প্রেস ব্রিফিং করেন।

যেভাবে চলত এই সাইবার অপরাধ

তদন্তে জানা যায়, চক্রটি অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যক্তিগত যন্ত্র থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করত। এ ছাড়া ব্রেকআপের পর প্রাক্তন প্রেমিকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ছবি বা শত্রুতাবশত প্রাপ্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিওগুলো তাঁরা টার্গেট করত। প্রথমে ‘ডেমো’ টেলিগ্রাম চ্যানেলে কিছু ছবি আপলোড করে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হতো। পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাঁদের ‘প্রিমিয়াম প্রাইভেট গ্রুপে’ যুক্ত করা হতো। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চক্রটি প্রতি মাসে অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা অবৈধভাবে আয় করত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) আহসান হাবীব পলাশ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাইবার–জগতের বিভিন্ন অনিয়ম-অপরাধগুলোকে সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে র‍্যাবের সাইবার মনিটরিং টিম। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পত্রিকায় প্রকাশিত সাইবার অপরাধগুলো আমলে নিয়ে র‍্যাব তাৎক্ষণিকভাবে কাজ শুরু করে। যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সুনিশ্চিত হওয়ার পর এই অভিযানসমূহ পরিচালনা করা হয়েছে, যার সফলতা আপনারা দেখতে পেয়েছেন। কিন্তু সফলতার চেয়েও বড় করে যে বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই, সেটি হচ্ছে, আমাদের প্রয়োজন সর্বস্তরে এ ধরনের সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করা।’

বিশেষজ্ঞের সতর্কতা

এই ভয়াবহ সাইবার অপরাধের বিষয়ে সাইবার নিরাপত্তাবিশ্লেষক জেনিফার আলম বলেন, ‘ব্যবহারকারীরা মনে করেন এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন তাঁদের রক্ষা করবে। কিন্তু অপরাধীরা এখন সরাসরি অ্যাপ হ্যাক না করে রিমোট অ্যাকসেস ট্রোজান (র‍্যাট) নামের ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ফোনটিরই নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। এর ফলে আপনার অজান্তেই ফোনের ক্যামেরা বা স্ক্রিন রেকর্ড হচ্ছে দূর থেকে।’

অনলাইনে নিরাপদ থাকতে জেনিফার আলমের পরামর্শ:

  • সংবেদনশীলতা বর্জন: ইন্টারনেটে কোনো কিছুই পুরোপুরি ব্যক্তিগত নয়। তাই একান্ত ছবি বা ভিডিও শেয়ার বা যন্ত্রে সংরক্ষণের আগে শতবার ভাবুন।
  • সন্দেহজনক লিংক ও ফাইল: ‘ভিডিওটি দেখতে ক্লিক করুন’–জাতীয় প্রলোভন দেখানো লিংকে ক্লিক করবেন না। অপরিচিত নম্বর থেকে আসা পিডিএফ বা সংযুক্ত ফাইল ওপেন করা থেকে বিরত থাকুন।
  • নিরাপত্তা সেটিংস: সোশ্যাল মিডিয়া ও ই-মেইলে অবশ্যই টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখুন।
  • ডিভাইস শেয়ারিং: নিজের ব্যক্তিগত বা অফিসের যন্ত্র অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।
  • সেশন ও লগইন চেক করুন: Settings > Devices–এ গিয়ে দেখুন, আপনার অ্যাকাউন্ট অন্য কোনো ডিভাইসে বা অপরিচিত জায়গায় লগইন করা আছে কি না। সন্দেহ হলে ‘Terminate all other sessions’ দিন।
  • অপরিচিত গ্রুপে যুক্ত হওয়া নিয়ন্ত্রণ করুন: Privacy > Groups & Channels–এ গিয়ে ‘My Contacts’ সেট করুন, যাতে অচেনা কেউ আপনাকে কোনো সন্দেহজনক গ্রুপে অ্যাড করতে না পারে।
  • ফোন নম্বর লুকানোর অপশন: Privacy > Phone Number-এ গিয়ে ‘Nobody’ বা ‘My Contacts’ সেট করুন, যাতে অপরিচিত কেউ আপনার নম্বর না পান।
  • ভুয়া সাপোর্ট মেসেজ দ্বারা প্রতারিত হওয়া: টেলিগ্রাম অ্যাডমিন বা সাপোর্ট টিম দাবি করে কেউ বার্তা দিলে এবং ব্যক্তিগত তথ্য বা কোড চাইলে তা দেবেন না। টেলিগ্রাম কখনো মেসেজে আপনার পাসওয়ার্ড চায় না।
  • আইনি পদক্ষেপ: ব্ল্যাকমেলের শিকার হলে ভয় পেয়ে টাকা দেবেন না। টাকা দিলে ব্ল্যাকমেল থামে না, বরং বাড়ে। দ্রুত কাছের থানা বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জানান।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো হায়দার তানভীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন আইন পেশাজীবীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অপরাধীরা মূলত আমাদের প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা এবং সামাজিক লোকলজ্জার ভয়কে পুঁজি করে এই “অন্ধকার বাণিজ্য” পরিচালনা করছে। ফলে এই প্রেক্ষাপটে আইনি সুরক্ষার পরিধি ও ব্যক্তিগত সতর্কতার গুরুত্ব নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে উঠেছে।’