ঢাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলায় উন্নতি, এআই ক্যামেরা ও পেনাল্টি পয়েন্ট কার্যকর
ঢাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলায় উন্নতি, এআই ক্যামেরা ও পেনাল্টি পয়েন্ট

রাজধানী ঢাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত নজরদারি ক্যামেরা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য নতুন পেনাল্টি পয়েন্ট ব্যবস্থা চালুর পর চালকদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

সিগন্যাল মেনে চলছেন চালকরা

প্রধান মোড়গুলোতে লাল বাতি জ্বললেই যানবাহন নির্ধারিত স্টপ লাইনের পেছনে থামছে। মোটরসাইকেল, বাস, প্রাইভেট কার এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা সিগন্যাল মেনে চলছে বেশি। আগে যেখানে মোড়ে মোড়ে দ্রুত পার হওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল, সেখানে এখন তা অনেক কমে গেছে।

এআই ক্যামেরা ও ই-প্রসিকিউশন

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এআই-ভিত্তিক নজরদারি ক্যামেরা এবং ই-প্রসিকিউশন ব্যবস্থা চালু করেছে। ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, পরীক্ষামূলকভাবে ৭ মে এই ব্যবস্থা চালু হয়। এই সময়ে রাজধানীর সড়ক থেকে পাঁচ হাজারের বেশি ট্রাফিক লঙ্ঘনের ভিডিও ক্লিপ সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার ভিডিও টেকনিক্যাল ট্রাফিক ইউনিট (টিটিইউ) পর্যালোচনা করেছে এবং লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ প্রস্তুত করা হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় মামলা

পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই লঙ্ঘন স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে ডিজিটাল মামলা দায়ের করে যানবাহন মালিক ও চালকদের নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট মোহাম্মদ নুরুস সামাদ বাপী জানিয়েছেন, ড্রাইভিং লাইসেন্সের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পেনাল্টি পয়েন্ট ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি লাইসেন্সে ১২ পয়েন্ট থাকবে। কোনো চালক ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে একটি পয়েন্ট কাটা হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি বলেন, বিআরটিএ এবং ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে এই কাঠামো চূড়ান্ত করছে। আগে যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বরের বিরুদ্ধে মামলা হতো, এখন সরাসরি ড্রাইভিং লাইসেন্সের সঙ্গে জড়িত থাকায় চালক যেখানেই অপরাধ করুক না কেন পয়েন্ট কাটা যাবে। আর্থিক জরিমানাও বহাল থাকবে।

মোবাইল অ্যাপ ও আইনি কাঠামো

ডিএমপি সূত্র জানিয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২-এর আওতায় এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ‘রোড সেফটি পেনাল্টি সিস্টেম’ (আরএসপিএস) নামে একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হচ্ছে, যা সারা দেশে চালু হবে। সিগন্যাল লঙ্ঘন, গতিসীমা অতিক্রম, বেআইনি ওভারটেকিং, ভুল পথে চালানো, বেআইনি পার্কিং, যানজট সৃষ্টি এবং রোড সাইন না মানার মতো অপরাধে পয়েন্ট কাটা হবে। বারবার অপরাধ করলে সব পয়েন্ট শেষ হয়ে গেলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হতে পারে।

সফটওয়্যার উন্নয়ন চলছে

বিআরটিএর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এআই-ভিত্তিক প্রসিকিউশন এবং স্বয়ংক্রিয় পয়েন্ট কাটার জন্য সফটওয়্যার তৈরি চলছে। পুরো ব্যবস্থা চালু হতে আরও কিছু সময় লাগবে।

ইতিবাচক সাড়া

ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া ও জনসংযোগ) এনএম নাছিরুদ্দিন জানান, এই উদ্যোগ ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। আগের তুলনায় চালকরা সিগন্যাল বেশি মানছেন। এআই-ভিত্তিক প্রয়োগ ধীরে ধীরে পুরো রাজধানীতে সম্প্রসারিত হবে।

ক্যামেরা স্থাপন

ডিএমপি সূত্র জানায়, ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বিজয় সরণি, বাংলামোটর, জহুরুল গেট, সোনারগাঁও এবং কারওয়ান বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ১২৫টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এখনও এই ব্যবস্থার আওতায় আসেনি। বিজয় সরণির মেট্রোরেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় এখনও ম্যানুয়ালি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সেখানে ডিজিটাল সিগন্যাল বা জেব্রা ক্রসিং নেই এবং লঙ্ঘন প্রায়ই ঘটে।

চালকদের প্রতিক্রিয়া

এক মোটরসাইকেল আরোহী জানান, তিনি শুনেছেন স্টপ লাইন অতিক্রম করলেও মামলা হতে পারে, তাই এখন সাবধানে থাকেন। কারওয়ান বাজারে এক বাসচালক হেলমেট ছাড়া যাত্রী বহনকারী আরেকজনকে সতর্ক করে বলেন, সামনে ক্যামেরা, জরিমানা হবে। রাইড শেয়ারিং চালক মুসলিম উদ্দিন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এখন মানুষ নিয়ম মেনে চলছে। তবে তিনি রাতের বেলায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রাইভেট কার চালক আহসানুল হক জানান, কিছু মোড়ে যানজট কমেছে। পথচারী নাসিমা বেগম বলেন, এখন তিনি রাস্তায় নিরাপদ বোধ করেন।

পুলিশের মতামত

ট্রাফিক পুলিশ জানায়, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় তাদের কাজের চাপ কমেছে। আগে নিজে গাড়ি থামিয়ে মামলা করতে হতো, যা যানজট বাড়াত। ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হয়। কোনো সুপারিশ বা প্রভাব এখন আর কাজ করে না। তবে চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে অস্পষ্ট বা নম্বরপ্লেট না থাকা।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মোঃ আনিসুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি লঙ্ঘনের ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে, প্রায় এক হাজার মামলা প্রক্রিয়াধীন। ডিএমপির আগে ৮০টি পিটিজেড ক্যামেরা ছিল। এখন ছয়টি পয়েন্টে আরও ২৫টি এআই ক্যামেরা যুক্ত হয়েছে, মোট ১২৫টি। ট্রাফিক বিভাগ সূত্র জানায়, অনেক যানবাহনে সরকারি নম্বরপ্লেটের পরিবর্তে রঙ করা নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে, আবার কেউ কেউ ফি দিয়েও আরএফআইডি প্লেট সংগ্রহ করেনি। শিগগিরই এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে।

সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী, সিগন্যাল লঙ্ঘন, গতিসীমা অতিক্রম, অতিরিক্ত হর্ন ব্যবহার, বেআইনি পার্কিং, ওভারলোডিং, যানজট সৃষ্টি এবং ভুল পথে চালানোর মতো অপরাধে পেনাল্টি পয়েন্ট কাটা হবে।