চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন: নতুন আশা নাকি পুরনো চ্যালেঞ্জ?
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন: নতুন আশা নাকি চ্যালেঞ্জ?

দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে নানা জটিলতায় আটকে থাকার পর অবশেষে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল (চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন-সিইআইজেড) প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্মসূচির জন্য নতুন আশার আলো হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা। তবে একইসঙ্গে এটি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দেশে ঘোষিত অসংখ্য অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে এবং সেগুলোতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির অগ্রগতি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?

১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্বপ্ন কেন ধাক্কা খেল?

২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল শিল্প-কারখানার জন্য পরিকল্পিত জমি, উন্নত অবকাঠামো, সহজ প্রশাসনিক সেবা এবং রফতানিমুখী উৎপাদনের পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে দেখা যায়, অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার চেয়ে সেগুলোতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অনেক বেশি কঠিন। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, অবকাঠামো নির্মাণ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, বন্দর সুবিধা এবং অর্থায়ন—সব মিলিয়ে অনেক প্রকল্প বছরের পর বছর পিছিয়ে যায়। ফলে একসময় যে কর্মসূচিকে দেশের শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেজার কৌশল বদল: সংখ্যার বদলে কার্যকারিতায় জোর

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) গত বছর তাদের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল একসঙ্গে বাস্তবায়নের চেয়ে কয়েকটি সম্ভাবনাময় অঞ্চলকে সফলভাবে গড়ে তোলাই এখন প্রধান লক্ষ্য। বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, আগামী দুই বছরে পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো—জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এনএসইজেড), মিরসরাইয়ে জাপানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (জেএসইজেড), আড়াইহাজার, শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল, জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল। এই পাঁচটি অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সফল মডেল তৈরি করতে চায় সরকার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাস্তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল সক্রিয় কতটি?

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৯০টির বেশি অর্থনৈতিক অঞ্চল বিভিন্ন পর্যায়ে অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পূর্ণাঙ্গ শিল্প উৎপাদনে রয়েছে খুবই সীমিত সংখ্যক অঞ্চল। বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রায় ৩০ হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলকে দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান জমি বরাদ্দ নিয়েছে। কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে উৎপাদনে গেছে, আরও বহু কারখানা নির্মাণাধীন। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। বিশেষ করে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। তবে অধিকাংশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের চিত্র ভিন্ন। অনেক অঞ্চলে এখনও রাস্তা, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাস সংযোগ কিংবা পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। ফলে জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও শিল্প স্থাপনের গতি ধীর।

বিনিয়োগের চিত্র: প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান

অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য ছিল বিপুল পরিমাণ বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের এফডিআই প্রবাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, জমি বরাদ্দ পাওয়া গেলেও শিল্প স্থাপনে নানা ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে—গ্যাসের সংকট, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা, বন্দর ও লজিস্টিক ব্যয়ের উচ্চ হার এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় জটিলতা। বেজার হিসাব অনুযায়ী, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পাঁচটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রায় ৫৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে ১৩৩টির বেশি শিল্পকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে।

চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার এবং প্রধান বিদেশি বিনিয়োগ উৎসগুলোর একটি। গত কয়েক বছরে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, টেক্সটাইল, সিরামিক, ইলেকট্রনিক্স, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও উৎপাদনশীল শিল্পে চীনা বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলকে শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, বরং বাংলাদেশে চীনা শিল্প বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই অঞ্চল কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে কাঁচামাল আমদানি ও রফতানি উভয় ক্ষেত্রেই এটি বিশেষ সুবিধা দেবে। সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী, এই অঞ্চলে অন্তত ৫০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। টেক্সটাইল, পোশাক, ফার্মাসিউটিক্যালস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।

নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার ধারা অব্যাহত

এর মধ্যেই সরকার বরিশাল ও লালমনিরহাটে নতুন দুটি ইপিজেড এবং গাজীপুর, বরগুনা ও পিরোজপুরে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, নতুন অঞ্চল ঘোষণার আগে বিদ্যমান অঞ্চলগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা বেশি জরুরি। কারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, দ্রুত সেবা এবং ব্যবসা পরিচালনার সহজ পরিবেশ।

সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন সম্পন্ন করা। দ্বিতীয়ত, শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুমোদন ও সেবা প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করা। তারা বলছেন, ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। বাংলাদেশকেও সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু প্রকল্প অনুমোদন নয়, বরং বাস্তব বিনিয়োগ ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এই প্রকল্পের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে কত দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়, কতটা বিদেশি বিনিয়োগ আসে এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় তার ওপর। কারণ, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্মসূচির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন ঘোষণা নয়, বরং বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রমাণ করা।