বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করে পূর্ববর্তী ট্যারিফ পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)। সংগঠনটির দাবি, নতুন বিদ্যুৎ ট্যারিফ কার্যকর হলে প্রতি টন স্টিল উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১ হাজার ৭৮৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাবে, যা সংকটাপন্ন স্টিল শিল্পকে আরও বড় ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএ’র বক্তব্য
সোমবার (৮ জুন) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। বিএসএমএ’র সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের স্টিল শিল্প বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় অতিক্রম করছে। নির্মাণখাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, বাজারে চাহিদা হ্রাস, উচ্চ সুদহার, ডলারের সংকট, এলসি খোলার জটিলতা, গ্যাস সরবরাহ সংকট এবং পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে। এর মধ্যেই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।
স্টিল শিল্পের বর্তমান অবস্থা
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০টি আধুনিক স্টিল মিল এবং ১৫০টির বেশি রি-রোলিং মিল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১২ দশমিক ২ মিলিয়ন মেট্রিক টন হলেও দেশের বর্তমান বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে অধিকাংশ কারখানা উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশেরও কম ব্যবহার করছে।
অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব
বিএসএমএ জানায়, বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফের কারণে প্রতি টন স্টিল উৎপাদনে অতিরিক্ত ১ হাজার ৭৮৫ টাকা ব্যয় বাড়বে। ভ্যাট, বন্দর চার্জ, জ্বালানি, পরিবহণ ব্যয়, ফেরো-অ্যালয় এবং অন্যান্য কনজিউমেবলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হলে অতিরিক্ত ব্যয় প্রতি টনে প্রায় ৩ হাজার ৫৬০ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশের বড় স্টিল কারখানাগুলো ৩৩ কেভি, ১৩২ কেভি ও ২৩০ কেভি উচ্চ ভোল্টেজ লাইনের সরাসরি গ্রাহক এবং নিজস্ব অর্থায়নে সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমারসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সিস্টেম, ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন লস প্রায় নেই বললেই চলে। তারপরও ডিমান্ড চার্জ, পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য চার্জের মাধ্যমে শিল্পখাতের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়।
ভোক্তা ও অর্থনীতিতে প্রভাব
বিএসএমএ নেতারা বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বাড়তি ব্যয় পুরোপুরি ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে এর একটি বড় অংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বহন করতে হবে। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে স্টিলের বাজারমূল্যও বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়বে আবাসন, অবকাঠামো এবং নির্মাণ খাতে। তারা আরও বলেন, দেশে ব্যবহৃত মোট স্টিলের প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে স্টিলের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি মানেই সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাওয়া। এতে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় বাড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।
টেকসই সমাধানের আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএর পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব উৎপাদনশীল শিল্পখাতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। এতে শিল্প উৎপাদন কমবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হবে।
স্টিল শিল্পকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পখাত উল্লেখ করে সংগঠনটি সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে আগের মূল্যহার পুনর্বহালের আহ্বান জানায়।



