ভোলা সদর উপজেলায় জাঙ্গালিয়া নদীর তীরে চর ভেদুরিয়ায় ৫৮ একর জমির ওপর নতুন শিল্পপার্ক তৈরি করছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। বর্তমানে সেখানে কাঠামো তৈরির কাজ চলছে। ভোলা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ চরপাতা গ্রামে বছর তিনেক আগে গ্যাসক্ষেত্র খুঁজে পায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স)। সেই ইলিশা গ্যাসক্ষেত্র ইতিমধ্যে গ্যাস উত্তোলনের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু উৎপাদন থেমে আছে। কারণ, ভোলায় বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে।
গ্যাসের মজুত ও সম্ভাবনা
বাপেক্সের হিসাব অনুযায়ী, ভোলায় বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত আছে, যা আরও বেশি হতে পারে। ১৯৯৫ সালে প্রথম শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স, সেখান থেকে উৎপাদন শুরু হয় ২০০৯ সালে। ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে আবিষ্কৃত ইলিশা থেকে এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর হিসাব বলছে, ভোলায় যে পরিমাণ গ্যাস আছে, তা দিয়ে যদি পুরোদমে জেলায় শিল্পায়ন গড়ে ওঠে, তাহলে অন্তত ৭০ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
শিল্পায়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবতা
বিভিন্ন সরকার ভোলার গ্যাস নিয়ে মোট চারটি পরিকল্পনা করেছিল: পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে নেওয়া, সিএনজিতে রূপান্তর করে জেলার বাইরে নেওয়া, এলএনজি করে জেলার বাইরে নেওয়া এবং ভোলাতেই ইপিজেড, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে গ্যাস ব্যবহার করা। এসব নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই হলেও কোনো সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোলায় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলাই সবচেয়ে ব্যয়সাশ্রয়ী। এটি বাস্তবায়ন করলে ভোলার অর্থনৈতিক অবস্থা বদলে যাবে এবং গ্যাসের সর্বোত্তম ব্যবহার হবে।
ভোলায় গ্যাস উত্তোলন করে বাপেক্স, আর তা কিনে ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করে সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। কোম্পানির ব্যবস্থাপক অলিউল ইসলাম জানান, ভোলার গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট, কিন্তু চাহিদা ৭০-৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে থাকায় উদ্বৃত্ত গ্যাস রয়েছে। যেকোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান চাইলে গ্যাস–সংযোগ নিতে পারে। একটি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস–সংযোগ দিতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে।
শিল্পকারখানার বর্তমান অবস্থা
ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া, ভেলুমিয়া, চরসামাইয়া ও শিবপুর ঘিরে গ্যাসভিত্তিক শিল্পায়ন ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট সড়ক ধরে ব্যাঙ্কেরহাট বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভোলা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের পাশের মাঝিরহাট এলাকায় একটি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। চরকালী মৌজায় গড়ে উঠছে আবুল উলাইয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, যা উর্মি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। জমি ভরাট ও সীমানাপ্রাচীর তৈরির কাজ শেষ হলেও বর্তমানে কাজ বন্ধ।
জাঙ্গালিয়া নদীর তীরে পশ্চিম ইলিশার সদুর চর মৌজায় প্রায় ১০০ একর জমির ওপর শেল্টেক্ সিরামিক কোম্পানি উৎপাদনে গেছে। জাঙ্গালিয়া নদীর তীরের চর সামাইয়া ইউনিয়নেও একাধিক প্রতিষ্ঠান জমি কিনেছে, যেখানে গড়ে উঠেছে ইটভাটা, অটো রাইসমিল ও হিমাগার। অটো অ্যাডভান্স টেক গ্যাস ব্যবহার করে ইট উৎপাদন করছে। কাজী ফিডও একটি সিরামিক কারখানা নির্মাণের জন্য জমি কিনে রেখেছে। শিবপুর ইউনিয়নের শান্তিরহাট এলাকায় মেঘনা নদীর তীরে প্রায় ১০০ একর জমি ভরাট করেছে একটি চীনা কোম্পানি, যেখানে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে।
ভোলা বিসিকের উপপরিচালক (সদ্য বদলি) মো. সোহাগ জানান, বিসিকে বর্তমানে ২৭টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে আছে, কিন্তু গ্যাস অনুমোদন জটিলতায় নতুন শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপক অলিউল ইসলাম বলেন, ভোলায় ৯টি প্রতিষ্ঠান গ্যাস–সংযোগের অনুমোদন পেয়েছে; এর মধ্যে ৭টি উৎপাদনে আছে। বাকি দুটি আবুল উলাইয়া টেক্সটাইল ও প্রাণ-আরএফএল এখনো চালু হয়নি।
প্রাণ-আরএফএলের শিল্পপার্ক
চর ভেদুরিয়ায় ৫৮ একর জমির ওপর প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের শিল্পপার্ক তৈরির কাজ চলছে। এ পর্যন্ত জমি ক্রয়, ভরাট, নদীভাঙন থেকে সুরক্ষা, আবাসন ও অফিস নির্মাণ, লাইসেন্স এবং শিল্প অনুমোদনসহ প্রায় ৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য। পুরোদমে চালু হলে এই শিল্পপার্কে ২৫ হাজার কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তেঁতুলিয়া নদীর তীরে অবস্থান হওয়ায় নদীপথে পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে সহজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল বলেন, ‘এ শিল্পপার্কটি পুরোপুরি চালু হলে ভোলার অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে। স্থানীয় জনগণের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। জেলার মানুষের কাজের জন্য জেলার বাইরে যেতে হবে না।’
ভোলার গ্যাস নিয়ে আন্দোলন
ভোলায় গ্যাস সরবরাহ শুরুর পর প্রায় ৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন বসিয়ে বাসাবাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে ২ হাজার ৩০০টির বেশি বাসায় গ্যাসের সংযোগ আছে, কিন্তু নতুন সংযোগ বন্ধ। ২০২৩ সালের ২১ মে সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি বেসরকারি কোম্পানি ইন্ট্রাকোর সঙ্গে একটি চুক্তি করে, যার অধীনে ইন্ট্রাকো ভোলার গ্যাস ঢাকায় নিয়ে যায়। এর প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দারা পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। দাবিগুলো হলো: ভোলার প্রতিটি ঘরে গ্যাসের সংযোগ, গ্যাসভিত্তিক বৃহৎ সার কারখানা ও ইপিজেড স্থাপন, একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা ও বিদ্যমান হাসপাতালের আধুনিকায়ন, দ্রুত ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ এবং নদীতীর ভাঙন রোধ ও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন।
ভোলা জেলা প্রশাসক শামীম রহমান বলেন, সম্প্রতি শেষ হওয়া ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেছেন, ভোলার গ্যাস ভোলায় ব্যবহার করে শিল্পকারখানা ও সার কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব, যাতে ব্যবসায়ীরা সহজেই পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পৌঁছাতে পারেন। ভোলাতে পর্যাপ্ত জমি আছে, এখানে শিল্পকারখানা নির্মাণ হলে দক্ষিণাঞ্চলের বেকারত্ব দূর হবে।
জমির দাম বৃদ্ধি
শিল্পায়নের প্রভাবে ভোলায় জমির দাম দ্রুত বেড়েছে। গত ৩০ বছরে কোথাও কোথাও জমির দাম ৩০০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। ভোলা পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. মানিক মিঞা ১৯৯৬ সালে ১০ হাজার টাকায় পৌনে তিন শতাংশ জমি কিনেছিলেন, বর্তমানে তা প্রতি শতাংশ ৮-১০ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুর রব ২০০৫ সালে ১৩ লাখ টাকায় ৫ শতাংশ জমি কিনেছিলেন, এখন প্রতি শতাংশ ২৫ লাখ টাকা। কালীবাড়ি রোড ও ওয়েস্টার্নপাড়া এলাকায় জমির দাম সবচেয়ে বেশি, যেখানে শতাংশ ২০-২৫ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভোলার উন্নয়ন সূচক ও সম্ভাবনা
১৯৮৪ সালে জেলার মর্যাদা পাওয়া ভোলা এখনো দেশের দরিদ্র জেলাগুলোর একটি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের প্রকাশিত জাতীয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে (এমপিআই) ভোলাসহ ৫টি জেলায় ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। জেলায় সাক্ষরতার হার ৬৭ দশমিক ২১ শতাংশ, যা জাতীয় গড় ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশের চেয়ে কম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে ভোলা অন্যতম। ভোলার গ্যাস রক্ষায় দক্ষিণাঞ্চলীয় নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক মোবাশ্বির উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এই জেলায় এত সম্পদ, অথচ উন্নয়নের সূচকে এটি সব দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে। ভোলার গ্যাস দিয়ে ভোলাতেই শিল্পের বিকাশ হলে বাংলাদেশের বৃহত্তর এই বদ্বীপের আর্থসামাজিক অবস্থা বদলে যাবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক ও জ্বালানিবিশেষজ্ঞ বদরূল ইমাম বলেন, ‘শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা—যা–ই হোক, ওখানেই (ভোলা) করা যেতে পারে। পরিবহন করার সুবিধা থাকলে সেটা পরে করা যেতে পারে। কিন্তু তার জন্য গ্যাসের ব্যবহার আটকে রাখার কোনো কারণ নেই।’



