রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফুয়েল লোডিং লাইসেন্স প্রাপ্তি চূড়ান্ত ধাপ
রূপপুরের ফুয়েল লোডিং লাইসেন্স চূড়ান্ত ধাপে

পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল প্রক্রিয়া। এ ধরনের স্থাপনা চালুর আগে বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তার কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হয়। সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জন্য ‘ফুয়েল লোডিং’ কমিশনিং লাইসেন্স প্রাপ্তি মূলত কেন্দ্রটি সচল করার চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

লাইসেন্সের গুরুত্ব ও প্রক্রিয়া

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই লাইসেন্স পাওয়ার অর্থ হলো পারমাণবিক চুল্লি বা রিঅ্যাক্টরে জ্বালানি স্থাপনের আনুষ্ঠানিক অনুমতি লাভ করা, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম এই প্রক্রিয়ার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে একে একটি ‘পাইলট অপারেশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তার মতে, ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপনের পর প্রায় ছয় মাস থেকে এক বছর সময় ধরে বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা চালানো হয়। এই সময়ে দেখা হয় পাওয়ার তৈরির মাধ্যমে সিনক্রোনাইজেশন ঠিকমতো হচ্ছে কি না, টারবাইন জেনারেটর সঠিকভাবে কাজ করছে কি না এবং জরুরি সব সাপোর্ট সিস্টেম সক্রিয় আছে কি না। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় শুধুমাত্র জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন করতেই প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লেগে যায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিভাবে কাজ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মূলত ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বা নিউক্লিয়াস বিভাজন প্রক্রিয়ায় কাজ করে। এই প্রক্রিয়ায় পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। সেই তাপ দিয়ে পানিকে উচ্চচাপে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এটি একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই ধাপগুলো সফলভাবে শেষ করার পর ‘কমার্সিয়াল অপারেশনাল ডেট’ বা সিওডি নির্ধারণের আগে চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে চুল্লিটি তার ৯০ শতাংশ সক্ষমতায় টানা ১৮ মাস চলতে থাকে, এরপর আবার রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে।

নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড

পারমাণবিক প্রকল্পের বিশাল সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের গভীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) কর্তৃক নির্ধারিত অগ্নি নিরাপত্তা, ইভাকুয়েশন প্ল্যান বা জরুরি অবস্থায় মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এবং সার্বিক সাপোর্ট সিস্টেম নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন যে, নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র আপস করার কোনো সুযোগ নেই।

পারমাণবিক শক্তি কমিশন অবশ্য আশ্বস্ত করেছে যে, প্রথম ইউনিটের এই কমিশনিং লাইসেন্স অর্জনের আগেই সব ধরনের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রতিটি ধাপের মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, আইএইএ-র প্রতিটি নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে এবং সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই দেশের প্রথম এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করা হচ্ছে।