অন্যের বাজার টানলেও নিজের ঘরে নেই খাবারের জোগান
অন্যের বাজার টানলেও নিজের ঘরে নেই খাবারের জোগান

কাঁচাবাজারে ‘মিন্তি’ নামে পরিচিত একদল মানুষ কাজ করেন, যার অর্থ কুলি। এই মানুষগুলো অন্যের বাজার বহন করেই নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করেন। এমনই একজন মো. তরিকুল ইসলাম। প্রায় দুই দশক ধরে রাজধানীর মিরপুরের ১ নম্বরের কাঁচাবাজারে মিন্তির কাজ করছেন তিনি।

প্রতিদিনই অন্যের বাজার বহন করলেও তরিকুলের নিজের ঘরের বাজারের খবর নেই। প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানোই তার জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সীমিত আয়, বাড়তি খরচ আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে তার সংসার চলে টানাপোড়েনের মধ্যে।

তরিকুলের ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “নিজের বাজারের খবর নাই, অন্যের বাজার টানি।” এই একটি বাক্যেই যেন ধরা পড়ে তার জীবনের নির্মম বাস্তবতা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) মিরপুর ১ নম্বরের কাঁচাবাজারে গেলে দেখা যায়, তরিকুল মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ঘুরছেন বাজার করতে আসা ক্রেতাদের কাছে কাছে। যদি কেউ তাকে ডেকে বাজারের ব্যাগগুলো দেয় তার ঝুড়িতে বহন করতে। কিন্তু, কেউ ডাকছিলো না। এসে বসেন চায়ের দোকানে। সে সময় কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে।

তরিকুল বলেন, “আজকে সকাল ৯টা থেকে কাজ শুরু করেছি, এখন বাজে সাড়ে ১২টা। দুইশো টাকার মতো ইনকাম হয়েছে মাত্র। লোকজনই নাই ইনকাম হবে কীভাবে। বৃহস্পতিবার অবশ্য এমনিতেও বাজারে মানুষ কম থাকে। আজকে দুপুর ২টা-আড়াইটার মধ্যেই চলে যাবো বাসায়।”

তিনি আরও বলেন, “সাধারণ সময়ে সকাল ৮টা থেকে কাজ শুরু করি। দুপুরে বাসায় গিয়ে খেয়ে আবার বিকালে কাজ শুরু করি। রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ করি।”

তিনি জানান, প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর ধরে তিনি এই মিন্তির কাজ করছেন। অন্য কোনও কাজ আর তিনি করেননি কখনও। তার গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার মদন থানায়। তবে, বর্তমানে পরিবারসহ থাকেন মিরপুর ১ নম্বরের কাঁচাবাজারের পেছনের এলাকায়। পরিবারে তার স্ত্রীসহ তিন ছেলে রয়েছে। বড় ছেলে মুফতি পড়ছে, মেঝ ছেলে হাফেজি পড়ছে আর ছোট ছেলে স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সন্তানদের শুধু শিক্ষার খরচ বহন করতেই হিমশিম খেতে হয় তরিকুলকে। এর সঙ্গে রয়েছে বাড়িভাড়া ও খাবার খরচ। এছাড়া গ্রামে মাকেও পাঠাতে হয় টাকা। এমন সময়েই নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। যার চাপে তিনিও দিশেহারা অন্যান্য সাধারণ ক্রেতাদের মতো। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই ক্রমবর্ধমান অসামঞ্জস্যতা কঠিন করে তুলছে তরিকুলের জীবন।

তিনি বলেন, “আমার জীবনটা সত্যিই অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনোরকমে আল্লাহ বাঁচিয়ে রেখেছে। যতটুকু না হলেই না, ততটুকু খেয়েই বেঁচে আছি। জিনিসপত্রের দাম এতো ছিল না। এখন খুব কষ্টে আছি। গ্যাসের দাম বাড়ছে, সকল কিছুর দাম বাড়ছে। আগে তো এটা ছিল না।” এ সময় নিজেদের খাবারের ব্যাপারে তরিকুল বলেন, “খুব সামান্য খাবার খেয়েই থাকি। সপ্তাহে একবার হয়তো মুরগি (ব্রয়লার) অথবা মাছ খাই। দুইটা এক সপ্তাহে খাওয়া যায় না। মাছ খেলে যেগুলোর দাম কম যেমন শিং, কই, পাঙ্গাস এগুলোই খাই। এছাড়া সবজি খাই। সবজিগুলো বাজারের ভেতরে থেকে কিনি না, কারণ এখানে দাম বেশি। রাস্তার পাশে কম দামে যেগুলো পাওয়া যায় সেগুলো কিনি। সন্ধ্যার পরে ওগুলোর দাম আরও কমে যায়।”

তিনি আরও বলেন, “সবজি না হয় কম দামে কিনি, কিন্তু দোকানের (মুদি পণ্য) জিনিসতো আর কম দামে পাওয়া যায় না। ওগুলো তো বেশি দামেই কিনতে হয়। খেতে তো হবে, দাম হলেও খেতে হবে। তাই অল্প অল্প নেই। প্রতিদিন এক থেকে দেড় কেজি চাল, আধা পোয়া তেল কিনি, আর কিছু সবজি, এভাবেই চলছে। অন্যের বাজার নিয়ে ঘুরি, নিজের বাজার কীভাবে করবো? ইনকাম যেভাবে হয় সেভাবেই তো বাজার করতে হয়। নিজের বাজারের খবর নাই, অন্যের বাজার টানি, এই আরকি। এভাবেই আমাদের জীবন চলে যাচ্ছে।”

তরিকুল ইসলাম জানান, তার স্ত্রী গার্মেন্টসে কাজ করেন, যেখানে তিনি মাসে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা আয় করেন। তার নিজের দৈনিক আয় গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। অর্থাৎ, মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। আর দু’জনের মোট আয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু, তাদের বাসা ভাড়া চার হাজার ২০০ টাকা। এছাড়া তিন সন্তানের পড়াশোনার খচর প্রায় ২০ হাজার টাকা। অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে তাদের কষ্ট হয়। ধারদেনাও করতে হয় বলে জানান তিনি।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষের কিছু করার নেই। আমার মতো গরীব মানুষের কথা কে শুনে? সরকার কি আমার কথা শুনতে পায়? পায় না। তাই আমাদের বলারও কিছু নাই। এতটুকুই আশা করি, সরকার যদি উদ্যোগ নেয় আর যদি দাম কিছুটা কমে, তাহলে আমাদের মতো মানুষের কিছুটা হলেও উপকার হবে।”