নিরাপদ খাদ্যে উত্তম কৃষিচর্চার বিকল্প নেই: গোলটেবিল
নিরাপদ খাদ্যে উত্তম কৃষিচর্চার বিকল্প নেই

দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ‘উত্তম কৃষিচর্চা’ বা গ্যাপ (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস) সম্প্রসারণ জরুরি। গতকাল রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘উত্তম কৃষিচর্চা ও খাদ্যব্যবস্থা: টেকসই বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ অভিমত জানান। হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও প্রথম আলো যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে।

উত্তম কৃষিচর্চায় রোগ ঝুঁকি কমে

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, মানবদেহের প্রধান জ্বালানি হলো খাদ্য। খাদ্যে দূষণ থাকলে পুরো শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। উত্তম কৃষিচর্চা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে মানুষের রোগবালাই অনেকাংশে কমে যাবে। এটি সুস্থ জাতি গঠন ও বিদেশে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে মুখ্য ভূমিকা রাখবে। খাদ্যের মাধ্যমেই মানুষের শরীরে ক্যানসার, চর্মরোগ, গ্যাস্ট্রিকসহ নানা জটিল রোগ ছড়াচ্ছে। তাই খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় কৃষকের মধ্যে উত্তম কৃষিচর্চা নীতিমালা অনুসরণকে উৎসাহিত করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ফলন বাড়ানোর সম্ভাবনা

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মো. আফছার আলী বলেন, অনলাইনে মাটির ধরন ও ফসলের নাম জানিয়ে কৃষকেরা এখন সহজেই সুষম সার ব্যবহারের পরামর্শ পেতে পারেন। ইউরিয়া বা টিএসপির পাশাপাশি দস্তা, বোরন ও সালফারের মতো অণুপুষ্টি সুষম মাত্রায় ব্যবহার করলে ফসলের ফলন ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। তবে ভারী ধাতুর (যেমন সিসা বা আর্সেনিক) মতো সংবেদনশীল তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি। সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ছাড়া এ ধরনের তথ্য প্রকাশ পেলে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চ্যালেঞ্জ ও সমাধান

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহমেদ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি উত্তম কৃষিচর্চায় ২০-৪০% ফসল-পরবর্তী ক্ষতি এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বিত বাজারব্যবস্থার অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ বলে উল্লেখ করেন। হেইফার ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর নুরুন নাহার কৃষকের জীবনযাত্রা সহজ করতে ও আধুনিক প্রযুক্তি তাঁদের দুয়ারে পৌঁছে দিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি জানান, হেইফার পিছিয়ে পড়া নারীদের পাশাপাশি এখন পুরো কৃষক পরিবারের উন্নয়ন ও সমবায় সমিতি গঠনে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সক্ষমতা বৃদ্ধি

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) পুষ্টি ইউনিটের পরিচালক যাকীয়াহ্ রহমান বলেন, নিরাপদ ও জলবায়ু-সহিষ্ণু খাদ্য উৎপাদনে উত্তম কৃষিচর্চার বিকল্প নেই। বৈশ্বিক মানদণ্ড ঠিক রাখতে নিয়মকানুন কিছুটা জটিল হলেও মান কমিয়ে নয়; বরং কৃষকদের সক্ষমতা ও ল্যাবের সুবিধা বাড়িয়ে এটি বাস্তবায়ন জরুরি। ঢাকাস্থ নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার অ্যাগ্রিকালচার এ কে ওসমান হারুনী কৃষকদের বছরের বিভিন্ন সময়ে ভেঙে ভেঙে সহজ ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ এবং দলগত সনদ দেওয়ার কথা বলেন।

যোগাযোগ ও সচেতনতা জরুরি

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ন্যাশনাল হর্টিকালচারিস্ট ও জিএপি বিশেষজ্ঞ এম নাজিম উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উত্তম কৃষিচর্চা নিশ্চিত করতে নিরাপদ বালাইনাশক ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইংয়ের উপপরিচালক (রপ্তানি) এ কে এম মফিদুল ইসলাম বলেন, সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কৃষক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে শক্তিশালী যোগাযোগ গড়ে তোলা; যেন উৎপাদক বিক্রির নিশ্চয়তা পায় এবং ক্রেতাও সহজে রপ্তানিযোগ্য নিরাপদ পণ্য সংগ্রহ করতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পার্টনার প্রজেক্টের ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর মাহবুবা মুনমুন বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে নিরাপদ খাদ্য চেনানো সবচেয়ে জরুরি। নিরাপদ খাদ্য চেনানো গেলে বিশেষ দাম নির্ধারণ কোনো সমস্যা হবে না।