দেশের অন্যতম প্রধান সবজিভান্ডার হিসেবে পরিচিত পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় চলতি মৌসুমে কাঁচা মরিচের ব্যাপক ও বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া এবং কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে খেতজুড়ে এখন মরিচের সমারোহ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, হাজার হাজার টন মরিচ উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু এই বিপুল উৎপাদনই স্থানীয় কৃষকদের জন্য এক চরম অভিশাপ ও দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ভরা মৌসুমে কাঁচা মরিচের বাজারদর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে কৃষকদের খরচের খাতা মেলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
দামের চরম পতন
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাঁথিয়ার স্থানীয় হাটগুলোতে বর্তমানে কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ টাকা কেজি দরে। অথচ মাঠের বাস্তবতা হলো, গাছ থেকে এক কেজি মরিচ তুলতে শুধু খেতমজুরকেই দিতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকা। এরপর আছে হাটে আনা-নেওয়া ও অন্যান্য পরিবহন খরচ। তাহলে সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ এবং জমির ইজারা বা বর্গা ভাড়ার পেছনে বিনিয়োগ করা মূল পুঁজি আসবে কোথা থেকে? অথচ এই মরিচই যখন ঢাকার মতো বড় বড় শহরের খুচরা বাজারে পৌঁছাবে, তখন তা সাধারণ ভোক্তাকে কিনতে হবে কয়েক গুণ বেশি দামে। এই মধ্যস্বত্বভোগীবান্ধব ব্যবস্থার অবসান কবে হবে?
সংকটের মূল কারণ
কৃষির এই সংকটের পেছনে আমাদের সনাতন ও দুর্বল বিপণনব্যবস্থার পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণাগারের অভাব সরাসরি দায়ী। কাঁচা মরিচ একটি পচনশীল পণ্য। গাছে মরিচ পাকলে তা না তুলে রাখলে গাছ নষ্ট হয়ে যায়, পরবর্তী ফলন ব্যাহত হয়। এই নিরুপায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির ফড়িয়া ও আড়তদার সিন্ডিকেট পানির দরে কৃষকের ফসল কিনে নেয়।
কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহ বেশি হওয়ায় সাময়িকভাবে দাম কমেছে এবং সামনে দাম বাড়তে পারে। কিন্তু সেই 'সামনে' আসার আগেই যে প্রান্তিক কৃষক পুঁজিশূন্য হয়ে দেনার দায়ে ডুববেন, তাঁদের বাঁচানোর তাৎক্ষণিক দাওয়াই কী? গত বছর এই সময়ে মরিচের দাম চড়া থাকলেও রোগের কারণে ফলন কম হওয়ায় কৃষকেরা লাভ পাননি; আর এবার ফলন ভালো হলেও দামের অভাবে তাঁরা নিঃস্ব হচ্ছেন।
সমাধানের পথ
আমরা মনে করি, শুধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলেই কৃষি বিভাগের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বাম্পার ফলনের সময় কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। সাঁথিয়াসহ দেশের প্রধান সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে বিশেষায়িত হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা প্রয়োজন, যেন উদ্বৃত্ত ফসল সংরক্ষণ করে কৃষকেরা দর-কষাকষির সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। পাশাপাশি ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরের পাইকারি বাজারের সঙ্গে স্থানীয় চাষিদের সরাসরি যোগাযোগের জন্য 'কৃষক মার্কেট' বা সরকারি পরিবহনসুবিধার ব্যবস্থা করা দরকার।
প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন। সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন।



