বিশ শতকের ইতিহাসে খুব কম মানুষই আর্নেস্তো 'চে' গুয়েভারার মতো এতটা ভক্তি জাগাতে এবং একই সঙ্গে এতটা বিতর্ক উসকে দিতে পেরেছেন। আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া এই বিপ্লবী তাঁর জীবন ও মৃত্যু দিয়ে নিজেকে রূপান্তরিত করে গেছেন এক অনন্তকালীন বৈশ্বিক প্রতীকে।
চেহারাটি সঙ্গে সঙ্গে চিনে নেওয়া যায়—কালো বেরে টুপি, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, বাতাসে উড়ন্ত এলোমেলো চুল। ১৯৬০-এ কিউবান আলোকচিত্রী আলবার্তো কর্দার ধারণ করা বিখ্যাত আলোকচিত্র 'গেরিয়্যেরো হেরোইকো' (বীর গেরিলা) কালক্রমে হয়ে উঠেছে ইতিহাসের অন্যতম পুনরুৎপাদিত ছবি, যেটা অযুত-নিযুতবার অঙ্কিত বা উৎকীর্ণ হয়েছে টি-শার্ট থেকে শুরু করে প্রতিবাদী ব্যানার ও গ্যালারির দেয়ালে পর্যন্ত।
অথচ প্রতীকের আড়ালে থাকা মানুষটি ছিলেন প্রবল বিতর্ক ও বৈপরীত্যের কেন্দ্রবিন্দু। কেউ তাঁকে নিঃস্বার্থ বিপ্লবী নায়ক হিসেবে সম্মান জানান, আবার কেউ তাঁকে নির্মম মতাদর্শী হিসেবে নিন্দা করেন, যিনি বহু মৃত্যুদণ্ডের জন্য দায়ী। মৃত্যুর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর আজও তাঁর জীবন ও উত্তরাধিকার তীব্র আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
শৈশব ও শিক্ষা
আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আর্নেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ একজন প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী ছিলেন, আর মা সেলিয়া দে লা সের্না ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। শৈশব থেকেই তিনি তীব্র হাঁপানিতে ভুগতেন, যা সারাজীবন তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর দৃঢ় সংকল্পকে আরও শক্ত করেছে।
ছোটবেলা থেকেই গুয়েভারা ছিলেন একনিষ্ঠ পাঠক। পাবলো নেরুদা, জন কিটস, রবার্ট ফ্রস্ট থেকে শুরু করে কার্ল মার্ক্স পর্যন্ত সবার লেখা তিনি পড়তেন গভীর মনোযোগ দিয়ে। দাবা খেলায় দক্ষ ছিলেন এবং রাগবি খেলায়ও আগ্রহী ছিলেন। হাঁপানি তাঁকে শারীরিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখতে পারেনি; বরং শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অগ্রাহ্য করার মনোভাবই তাঁর জীবনের প্রতিটি বাধার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে ওঠে।
১৯৪৮ সালে তিনি বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন। নিজের অসুখকে বোঝা এবং অন্যদের সাহায্য করার ইচ্ছাই তাঁকে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের প্রেরণা দিয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থী থাকাকালেই তাঁর জীবনের গতিপথ আমূল বদলে যায়।
দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণ ও রাজনৈতিক জাগরণ
১৯৫২ সালে তিনি বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোর সঙ্গে মোটরসাইকেলে দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণে বের হন। এই ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত 'ভ্রমণের দিনলিপি' এবং ২০০৪-এর চলচ্চিত্র 'দ্য মোটরসাইকেল ডায়েরিজ'-এ অমর হয়ে আছে। এই সফর তাঁকে আমূল পাল্টে দেয়। চিলি, পেরু, কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলায় ঘুরে ঘুরে তিনি প্রত্যক্ষ করেন দারিদ্র্য, বৈষম্য ও শোষণের নির্মম বাস্তবতা।
পেরুর এক কুষ্ঠ কলোনিতে কাজ করার সময় তিনি দেখেন রোগীদের মর্যাদা এবং সামাজিক অবিচারের কারণে চিকিৎসা কতটা অপ্রতুল। তিনি দেখেন মার্কিন মালিকানাধীন খনিগুলোতে কীভাবে স্থানীয়দের নিঃস্ব করে সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে প্রতীতি জন্মায় যে লাতিন আমেরিকার সমস্যাগুলো মূলত কাঠামোগত, এবং সংস্কার নয়, সর্বাত্মক বিপ্লবই এর একমাত্র সমাধান।
চিকিৎসা ডিগ্রি ও আরও ভ্রমণ
১৯৫৩ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনের পর গুয়েভারা বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও এল সালভাদর ভ্রমণ করেন। গুয়াতেমালায় তিনি প্রত্যক্ষ করেন সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থান, যা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেঞ্জকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এ অভিজ্ঞতা তাঁর আমেরিকাবিরোধী মনোভাবকে আরও গভীর করে তোলে এবং তাঁর বিশ্বাস জন্মে যে প্রকৃত পরিবর্তন কেবল অস্ত্রের শক্তি দিয়েই রক্ষা করা সম্ভব।
কিউবান বিপ্লব
১৯৫৫ সালে মেক্সিকো সিটিতে ফিদেল কাস্ত্রো ও তাঁর ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে গুয়েভারার স্মরণীয় সাক্ষাৎকার ঘটে। ফিদেল তখন কিউবায় ফুলহেনসিও বাতিস্তার একনায়কতন্ত্র উৎখাতের পরিকল্পনা করছিলেন। চে গুয়েভারা সেই বিপ্লবী আন্দোলনে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। কাস্ত্রো যখন সন্দেহ প্রকাশ করেন, তখন গুয়েভারা ঘোষণা করেন, তিনি যেখানেই প্রয়োজন সেখানেই বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত।
১৯৫৬ সালের ২ ডিসেম্বর চে এবং আরও ৮১ জন বিপ্লবী 'গ্রানমা' নামের ইয়টে করে মেক্সিকো থেকে কিউবার উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু লাস কলোরাদাস উপকূলে অবতরণের পর তাঁরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। বাতিস্তা বাহিনীর আক্রমণে দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়; অনেকে নিহত, বন্দী বা নিখোঁজ হন। শেষ পর্যন্ত মাত্র অল্প কয়েকজন যোদ্ধা সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতে পুনরায় সংগঠিত হতে সক্ষম হন। সেখান থেকেই কিউবান বিপ্লবের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
পরবর্তী দুই বছরের গেরিলা অভিযানগুলো গুয়েভারাকে সামরিক কৌশলবিদ ও কমান্ডার হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়। আনুষ্ঠানিক সামরিক প্রশিক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বভাবজাত গেরিলা যোদ্ধা ও নেতা ছিলেন। তাঁর শৃঙ্খলাবোধ, সাধারণ সেনাদের সঙ্গে কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা এবং পলায়ন বা বিশ্বাসঘাতকতার কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় তিনি স্কুল ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন।
১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে গুয়েভারা সান্তা ক্লারার ঐতিহাসিক যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁর বাহিনী একটি সাঁজোয়া ট্রেনকে লাইনচ্যুত করে। এ বিজয় বাতিস্তার পতন নিশ্চিত করে। ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি বাতিস্তা কিউবা থেকে পালিয়ে যান এবং বিপ্লবীরা ক্ষমতা গ্রহণ করে। হাঁপানি রোগগ্রস্ত আর্জেন্টিনীয় চিকিৎসক তখন বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত গেরিলা কমান্ডারে রূপান্তরিত হন।
কিউবার বিপ্লবী সরকারে ভূমিকা
কিউবার নতুন সরকারে ফিদেল কাস্ত্রো প্রধানমন্ত্রী হলেও, গুয়েভারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। তিনি কিউবার জাতীয় ব্যাংকের সভাপতি ছিলেন (শোনা যায়, তিনি নতুন মুদ্রায় নিজের ডাকনাম 'চে' দিয়ে স্বাক্ষর করতেন) এবং পরে শিল্পমন্ত্রী হন। কিন্তু তাঁর অর্থনৈতিক নীতি বিতর্কিত ও প্রায়ই ব্যর্থ হয়েছিল। পাহাড়ে গেরিলা–জীবনে অভ্যস্ত এই রোমান্টিক বিপ্লবী আমলাতান্ত্রিক অফিসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না।
তিনি দ্রুত শিল্পায়ন ও কৃষি সমবায়ীকরণের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু তাঁর পদক্ষেপগুলো প্রায়ই হতাশাজনক ফল বয়ে এনেছে। তিনি বস্তুগত প্রণোদনার বদলে 'নৈতিক প্রণোদনা'র পক্ষে ছিলেন, বিশ্বাস করতেন বিপ্লবী চেতনা শ্রমিকদের মজুরি বা বোনাসের নয়, বরং তাদের কাজের প্রেরণা হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে এ তত্ত্ব কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে।
গুয়েভারার উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি ছিল প্রাথমিক বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালে তাঁর ভূমিকা। লা কাবানিয়া দুর্গ কারাগারের কমান্ডার হিসেবে তিনি বাতিস্তা শাসনের অধীন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত শত শত ব্যক্তির বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা কয়েক শ থেকে হাজারেরও বেশি ছিল বলে অনুমান করা হয়। গুয়েভারা এসব কর্মকাণ্ডের জন্য কখনোই কোনো দুঃখ প্রকাশ করেননি; তিনি এগুলোকে প্রয়োজনীয় বিপ্লবী ন্যায়বিচার হিসেবেই দেখতেন।
আন্তর্জাতিকতাবাদ ও বলিভিয়া অভিযান
গুয়েভারা কখনো বিপ্লবকে কেবল কিউবায় সীমাবদ্ধ ভাবেননি। তিনি আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাস করতেন এবং লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ায় বিপ্লব ছড়িয়ে দিতে চাইতেন। ১৯৬৪ সালে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন, যেখানে তিনি সাম্রাজ্যবাদের তীব্র সমালোচনা করেন।
১৯৬৫ সালে গুয়েভারা কিউবান নাগরিকত্ব ও মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করে জনচক্ষুর আড়ালে চলে যান। ফিদেল কাস্ত্রোকে লেখা বিদায়ী চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, যেখানে সম্ভব সেখানেই তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। প্রথমে তিনি কঙ্গোতে যান এবং লরাঁ-দেজিরে কাবিলার বিদ্রোহকে সহায়তা করেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, জনসমর্থনের অভাব এবং আফ্রিকান পরিস্থিতিতে কিউবান গেরিলা মডেল কাজে লাগাতে না পারায় এ অভিযান ব্যর্থ হয়।
হতাশ না হয়ে গুয়েভারা পরবর্তী লক্ষ্যস্থির করেন বলিভিয়ায়। তাঁর বিশ্বাস ছিল, দেশটির কৌশলগত অবস্থান ও দরিদ্র আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিপ্লবের জন্য উপযুক্ত। ১৯৬৬ সালের নভেম্বরে তিনি অল্প কয়েকজন কিউবান ও বলিভিয়ান যোদ্ধাকে নিয়ে বলিভিয়ায় পৌঁছান। কিন্তু স্থানীয় কৃষকেরা বিদেশি যোদ্ধাদের প্রতি সন্দেহপ্রবণ ছিল এবং সরকারি সংস্কারের মাধ্যমে সদ্য জমি পেয়েছিল। বলিভীয় কমিউনিস্ট পার্টি গুয়েভারার বিপ্লব প্রচেষ্টাকে সমর্থন করতে অস্বীকার করে। সিআইএ-র প্রশিক্ষিত বিশেষ বাহিনী তাঁর গতিবিধি অনুসরণ করতে থাকে। হাঁপানির আক্রমণ, অপরিচিত ভূখণ্ডে লড়াই এবং ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার কারণে তাঁর বাহিনী ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।
মৃত্যু
১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর বলিভীয় সেনারা লা হিগেরার পাহাড়ে গুয়েভারাকে আটক করে। পরদিন বলিভীয় সরকারের নির্দেশে এবং সিআইএ-সমর্থিত অভিযানের প্রেক্ষাপটে একজন বলিভীয় সার্জেন্ট আহত গুয়েভারাকে গুলি করে হত্যা করে। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র উনচল্লিশ।
একটি লন্ড্রি রুমে চোখ খোলা অবস্থায় ফেলে রাখা তাঁর লাশের ছবিকে অনেকে ক্রুশে মৃত্যুবরণকারী যিশুখ্রিষ্টের ছবির সঙ্গে তুলনা করে থাকে। মৃতদেহটি গোপনে একটি নামহীন কবরে সমাহিত করা হয়। পরে ১৯৯৭ সালে কবরটি আবিষ্কৃত হলে লাশটি কিউবায় ফিরিয়ে আনা হয়। বর্তমানে তাঁর দেহাবশেষ সান্তা ক্লারার চে গুয়েভারা সমাধিসৌধে সংরক্ষিত আছে।
বিতর্কিত উত্তরাধিকার
চে গুয়েভারার উত্তরাধিকার সম্ভবত বিশ শতকের অন্য কোনো বিপ্লবীর চেয়ে বেশি বিতর্কিত। সমর্থকদের কাছে তিনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীতিগত প্রতিরোধের প্রতীক, যিনি ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন বিশ্বাসের বেদিমূলে। তাঁরা তাঁর দরিদ্রদের প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার, নীতির প্রতি অবিচল জীবনযাপন এবং সাম্রাজ্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থানকে তুলে ধরেন।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে গুয়েভারা ছিলেন এক সর্বাধিপত্যমূলক মতাদর্শী, যাঁর রোমান্টিক বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিমালা অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ও মানবিক দুর্ভোগ ডেকে এনেছিল। তাঁরা তাঁর নির্দেশে সংঘটিত মৃত্যুদণ্ড, ভিন্নমত সহ্য না করা, কিউবায় ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতি এবং কিউবান মিসাইল–সংকটে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেওয়ার ইচ্ছার কঠোর সমালোচনা করে থাকেন।
প্রতীকের বাণিজ্যিক রূপান্তর
চে-র প্রতিচ্ছবি আধুনিক পুঁজিবাদের অন্যতম বড় বিদ্রূপে পরিণত হয়েছে। যে মুখ একসময় পুঁজিবাদ-বিরোধিতার বিপ্লবী প্রতীক ছিল, আজ তা বহুজাতিক করপোরেশনের পণ্য বিক্রি করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বাণিজ্যিকীকরণকে গবেষকেরা তাঁর ভাবনার অবমূল্যায়ন এবং পুঁজিবাদের সেই ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখেন, যা সবচেয়ে কঠোর সমালোচকদেরও শোষণ করে নিরপেক্ষ ও নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।
জটিল বিপ্লবী চরিত্র
চে গুয়েভারার সত্যগুলোকে সহজভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায় না। তিনি নিঃসন্দেহে সাহসী, নীতিমান এবং বিশ্বাসের জন্য নিজের সব স্বাচ্ছন্দ্য ও সম্পূর্ণ জীবন উৎসর্গে সদা প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর লেখায় দেখা মেলে প্রকৃত বৌদ্ধিক কৌতূহল ও সাহিত্যিক প্রতিভার। তিনি অতি সাধারণভাবে জীবন যাপন করে গেছেন, কোনো বিশেষ সুবিধা নিতে কখনোই রাজি হননি।
তারপরও নিজের মতাদর্শের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর, ভিন্নমত একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না এবং নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য চরম সহিংসতা প্রয়োগেও প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো কার্যত অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সশস্ত্র বিপ্লবের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার শত্রুদের পাশাপাশি তাঁর বহু অনুসারীরও মৃত্যু ডেকে এনেছে।
টি-শার্টে ছাপা যে মুখটি আমরা দেখি, সেটা আসলে এক জটিল মানুষকে আড়াল করে রাখে। তিনি কোনো বিপ্লবী মিথের ধর্মনিরপেক্ষ সন্ত ছিলেন না, আবার দানবীয় সর্বাধিপত্যমূলক কোনো চরিত্রও ছিলেন না। আসলে তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল আরও দ্ব্যর্থবোধক এবং শেষ পর্যন্ত সে জন্যই আরও বেশি আকর্ষণীয়। চে গুয়েভারাকে বোঝার জন্য তাঁর প্রতীকীকরণের বাইরে গিয়ে তাঁর আন্তরিক অঙ্গীকার ও গুরুতর ত্রুটি দুটি দিককেই দেখতে হবে সমভাবে।
আর্নেস্তো চে গুয়েভারার মৃত্যুর পর প্রায় ছয় দশক পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনো তিনি এক শক্তিশালী ও বিতর্কিত আইকন। কারও চোখে তিনি সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য নিঃস্বার্থ নিবেদিতপ্রাণ, আবার কারও চোখে তিনি মতাদর্শের চরম কঠোরতা ও বিপ্লবী সহিংসতার মূর্ত প্রতীক। সম্ভবত তাঁর উত্তরাধিকার এত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণই হলো এই জটিলতা।
তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের মনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে আসে: গভীর সামাজিক বৈষম্য নিরসন করা কীভাবে সম্ভব? সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লবী সহিংসতা কতটা ন্যায়সম্মত? এবং নিপীড়িতদের প্রতি ব্যক্তির দায় কতটা?—এ প্রশ্নগুলো নিশ্চিত করে যে আগামী প্রজন্মেও চে গুয়েভারা বিতর্ক ও চিন্তার বিষয় হয়ে থাকবেন।



