হাওরে অস্থায়ী বাঁধের ফাঁদে কৃষক: জলাবদ্ধতায় ডুবছে ফসল, বাড়ছে সংকট
সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষায় প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয়ে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হলেও এবার অতিবৃষ্টিতে তা নতুন সংকট তৈরি করেছে। জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকদের ধানখেত তলিয়ে যাচ্ছে, বাঁধ নিয়ে বিবাদে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। স্থানীয় কৃষক ও গবেষকরা বলছেন, প্রকৃতিবান্ধব স্থায়ী সমাধান ছাড়া এ সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না।
জলাবদ্ধতা ও বাঁধের দ্বন্দ্ব
সুনামগঞ্জের দেখার হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। কোথাও বাঁধ ভেঙে ধানখেত ডুবে যাচ্ছে, আবার কোথাও পানিনিষ্কাশনের জন্য বাঁধ কাটতে গিয়ে মারামারি ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসনকে দুটি এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে।
কৃষকদের বিভক্তি ও ক্ষোভ
একই হাওরে বাঁধ নিয়ে কৃষকরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। কেউ বাঁধ কাটতে চাইছেন পানিনিষ্কাশনের জন্য, আবার কেউ বাঁধ রক্ষা করতে চাইছেন ফসল বাঁচাতে। উতারিয়া বাঁধের কাছে কৃষক আল আমিন বলেন, ‘বাঁধ না দিলে টাকা রুজি হবে না। স্লুইসগেট থাকলে হাওরের ধানের ক্ষতি হতো না।’ অনেক কৃষক দাবি করছেন, স্থায়ী জলকপাট নির্মাণ হলে এ সমস্যা হতো না, কিন্তু দাবি উপেক্ষিত হচ্ছে।
অস্থায়ী বাঁধের ইতিহাস ও সমস্যা
১৯৬৮ সাল থেকে হাওরে অস্থায়ী মাটির বাঁধ দেওয়া শুরু হয়। আগে কৃষকরা ফসল তোলার পর বাঁধ কেটে দিতেন নৌযাতায়াত ও মাছের প্রজননের জন্য।但现在 বাঁধের প্রকল্প বেড়ে গেছে, ঠিকাদারি প্রথার পরিবর্তে পিআইসির মাধ্যমে কাজ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। গবেষক আজিজুর রহমান বলেন, ‘হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া বাঁধ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।’
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের অভিযোগ
সুনামগঞ্জে ফসল রক্ষা বাঁধের নামে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সদর উপজেলায় রাস্তা নির্মাণকে বাঁধ হিসেবে দেখিয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এতে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের ওবায়দুল হক বলেন, ‘প্রতিবছর অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের বিষয়ে জানানো হয়, কিন্তু যোগসাজশে কোনো ফল হয় না।’
আর্থিক ব্যয় ও স্থায়ী সমাধানের তাগিদ
পাউবোর তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ সালে ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, ধীরে ধীরে ব্যয় কমার কথা ছিল। কিন্তু ২০২২-২৩ সালে ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এবার কাবিটা প্রকল্পে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে কাজ হয়েছে। অধ্যাপক এ কে এম শামসুল ইসলাম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনে বৃষ্টি বাড়ছে, স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। স্লুইসগেট নির্মাণ ও হাওর খনন জরুরি।’
ভবিষ্যৎ পথ
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া দাবি করেন, বাঁধের কাজে গাফিলতি হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে হাওরের প্রকৃতি-পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ করা যাবে না। গবেষকরা জোর দিচ্ছেন সম্ভাব্যতা যাচাই ও স্থানীয় মতামতের ওপর। হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করে প্রকৃতিবান্ধব স্থায়ী কাঠামো নির্মাণই একমাত্র সমাধান বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



