২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলচণ্ডীর বাজার এখন সুনসান
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের শ্রীবাউর এলাকায় অবস্থিত মঙ্গলচণ্ডীর বাজার একসময় শত শত মানুষের কোলাহলে মুখর থাকত। প্রতি শুক্রবার বিকেলে শুরু হয়ে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চলত এই হাটের জমজমাট আয়োজন। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য বদলে গেছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, হাটবার হলেও পুরো এলাকা সুনসান। কোনো ক্রেতা-বিক্রেতা নেই, পণ্য নিয়ে আসেননি কেউ। টিনশেড ও উন্মুক্ত পাকা স্থান ফাঁকা পড়ে আছে, বেশির ভাগ দোকান বন্ধ।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও গুরুত্ব
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বাজারটি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। শ্রীবাউর গ্রামের মিরাশদার যতীন্দ্র মোহন কর এটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে 'বাবুর বাজার' নামে পরিচিত ছিল এটি। পরে একটি পুকুর খননের সময় মাটির নিচ থেকে মূর্তি পাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবারের সঙ্গে মিলিয়ে নাম হয় 'মঙ্গলচণ্ডীর বাজার'। তখন আশপাশে কোনো বাজার ছিল না, উন্নত সড়ক যোগাযোগও গড়ে ওঠেনি। কয়েক মাইল দূরের গ্রাম থেকেও মানুষ এখানে এসে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতেন এবং প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতেন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য, কৃষি উপকরণ এবং হাওরের মাছ কেনাবেচার অন্যতম কেন্দ্র ছিল এটি।
জৌলুশ হারানোর কারণ
স্থানীয়ভাবে সবজি উৎপাদন কমে যাওয়া, কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি, বাঁশ-বেতের তৈরি উপকরণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং হাওরের মাছ কমে যাওয়ার মতো নানা কারণে গত এক দশকে হাটটি ক্রমশ জৌলুশ হারিয়েছে। ২০১৫ সালের পর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় জেলা শহরে যাতায়াত সহজ হয়ে যায়, ফলে স্থানীয় মানুষ শহরমুখী হয়ে পড়েন। ভুজবল গ্রামের জুনেদ আবেদীন বলেন, 'এলাকায় আগে যারা শাকসবজি উৎপাদন করত, তাদের অনেকেই বিদেশ চলে গেছে। পেশা বদলে ফেলেছে। হাওরে মাছও এখন আগের মতো পাওয়া যায় না। এসব কারণে গ্রামের রাস্তাঘাট ভালো হওয়ায় মানুষ বাজার করতে শহরে চলে যায়।'
বর্তমান অবস্থা ও উদ্যোগ
বর্তমানে হাটে একটি ওষুধের দোকান, চায়ের দোকানসহ ছয়-সাতটি স্থায়ী দোকান আছে, যেগুলোও নিয়মিত খোলা থাকে না। দোকানিরা সুবিধামতো সময়েই দোকান খোলেন। শ্রীবাউর গ্রামের বাসিন্দা জিলদু মিয়া জানান, ক্রেতা-বিক্রেতার অভাবে বাজারটি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেলে ২০২১ সালের দিকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ কিছু ব্যক্তি বাজারটি পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু মাস দু-এক বাজার চলে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এখন কিছু স্থায়ী দোকান আছে, এইগুলোই চলে।
স্মৃতি ও সম্ভাবনা
বর্তমানে হাটটি আগের মতো প্রাণবন্ত না থাকলেও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে এটি এখনো জীবন্ত। 'মঙ্গলচণ্ডীর বাজার' নামটি এখনো মুখে মুখে ঘোরে। অনেকেই মনে করেন, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই ঐতিহ্যবাহী হাট আবারও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জুনেদ আবেদীন স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'বাজারটি জমজমাট থাকার সময় আমাদের বাড়ি থেকেও শব্দ শোনা যেত। মানুষের কথাবার্তায় শামশাম করত বাজার। সন্ধ্যার পর দূর থেকেও অন্ধকারে বাজারের বোমার আলো দেখা গেছে।'



