‘ধানের মণ ৮০০ টাকা, আর একজন শ্রমিকের মজুরি ১২০০ টাকা। তাহলে আমরা খামু কি, আর বেচমুই বা কি?’—হতাশাভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম। মঙ্গলবার দুপুরে ধান কাটার মাঠে দাঁড়িয়ে নিজের লোকসানের হিসাব মিলাচ্ছিলেন তিনি।
বাম্পার ফলনেও হতাশা
চলতি বোরো মৌসুমে জামালপুর জেলায় ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই। সোনালি ধানে মাঠ ভরে উঠলেও উৎপাদন খরচ ও শ্রমিকের আকাশছোঁয়া মজুরির কারণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর প্রতি বিঘা জমিতে ধান চাষে খরচ হচ্ছে প্রায় ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ ও পরিচর্যা খরচ তো আছেই, তার ওপর যোগ হয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট।
শ্রমিক মজুরি ও ধানের দামের ফারাক
এক বিঘা জমির ধান কাটতে অন্তত আটজন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ১২০০ টাকা মজুরি হিসেবে শুধুমাত্র ধান কাটতেই খরচ পড়ছে ৯ হাজার ৬০০ টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ২৪-২৫ মণ ধান উৎপাদন হলেও বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী (৮০০ টাকা মণ) বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২০ হাজার টাকার মতো। ফলে প্রতিটি বিঘা জমিতে কৃষকদের তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, ‘সব খরচ মিটিয়ে আসল টাকাই উঠছে না, লাভ তো দূরের কথা।’ মেলান্দহের কৃষক সুরুজ মিয়া জানান, অনেক বছর ধরে বাবার সাথে এবং পরবর্তীতে নিজে চাষাবাদ করলেও এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েননি কখনো। তিনি বলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়ছে, শ্রমিকের মজুরি ১২০০ অথচ ধানের দাম মাত্র ৮০০ টাকা। ৯ বিঘা জমির ওপর আমার সংসার চলে, এবার কী হবে আল্লাহ ভালো জানেন।’
কৃষি বিভাগের পরামর্শ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জামালপুরে ১ লাখ ২৬ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও বাজারমূল্য নিয়ে কৃষকদের এই হাহাকার কাম্য নয়। জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি তারা যেন এখনই সব ধান বিক্রি না করে এক বা দুই মাস পর বিক্রি করেন। এছাড়া সরকারি গুদামে ধান দিলে তারা বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম পাবেন। তবে পাইকারদের কাছে কম দামে বিক্রি করলে আমাদের সরাসরি কিছু করার থাকে না।’



