নেত্রকোনায় ঝলমলে রোদে স্বস্তি, পচা ধান শুকাতে ব্যস্ত কৃষক
নেত্রকোনায় রোদে স্বস্তি, পচা ধান শুকাতে ব্যস্ত কৃষক

নেত্রকোনায় সকাল থেকেই ঝলমলে রোদ। বৃহস্পতিবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোদের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। টানা বৃষ্টির দুর্যোগ-দুর্ভোগের পর এমন রোদে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন কিষান কিষাণিরা। তারা ধান তোলা ও শুকানোয় ব্যস্ত সময় পার করেছেন।

কৃষকদের প্রতিক্রিয়া

কৃষকেরা বলছেন, এভাবে আরও কয়েক দিন রোদ পাওয়া গেলে হাওড়ের ধান কাটা ও মাড়াই করা ধান শুকানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে যেসব জমির ধান তলিয়ে যায়নি, সেগুলো কাটা যাবে। তবে যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে ধান শুকাতে ভোগান্তি বাড়বে।

আবহাওয়ার তথ্য

জেলার আবহাওয়ার তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনায় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কোনো বৃষ্টি হয়নি। জেলার সোমেশ্বরী, কংস, উব্দাখালী, ধনুসহ অন্য নদ-নদীর পানি কিছুটা কমেছে। আগামী তিন দিন পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বৃহস্পতিবার সকালে আটপাড়া শুনই হাওড়ের খলায় ধান শুকাচ্ছিলেন আমেনা বেগম (৫৪)। আগের দিন কিছু ধান শুকিয়েছেন, কিন্তু খলায় জায়গা কম থাকায় আরও অনেক ধান রয়ে গেছে। সেই ধান বিছিয়ে দিচ্ছিলেন। প্রচণ্ড রোদ মাথায় নিয়েই তিনি সেই ধান নাড়ছিলেন। আমেনা বেগমের বাড়ি আটপাড়া উপজেলার শুনই গ্রামে।

কাজের ফাঁকে তিনি বলেন, আগে দিন বড় খারাপ গেছিল। কোনো কাজ করতে পারছি না। এখন দুইটা দিন ভালো পাইছি। যা পারি, তাড়াতাড়ি ধান শুকাতে হবে। কোন সময় যে মেঘ শুরু হয় ঠিক নাই।

বৃষ্টির প্রভাব

নেত্রকোনায় এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে বিভিন্ন হাওড়ে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। গত সোমবার থেকে দিনে বৃষ্টি না হওয়ায় হাওড়ের খলাগুলোতে চিরচেনা বৈশাখী আমেজ ফিরেছে। তবে গত বুধবার বিকালে আকস্মিক ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়। এতে কোনো কোনো এলাকার খলাতে ধান ভিজে যায়। আবহাওয়া ভালো থাকলে বৈশাখজুড়ে হাওড়ের খলাগুলোতে ধান তোলার উৎসব লেগে যায়। আবহাওয়ার কারণে গত কয়েক দিন হাওড়েই নামতে পারেননি কৃষকেরা। এতে অনেক হাওড়ের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গত ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হয় অতিবৃষ্টি, নামে উজানের পাহাড়ি ঢল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে টানা কয়েক দিন হাওড়েই নামতে পারেননি কৃষকেরা। এতে অনেক হাওড়ের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে হাওড়ের ফসল। কমবেশি সব হাওড়েই ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখন সোমবার থেকে রোদ ওঠায় মানুষ পুরোদমে হাওড়ে নেমেছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের সাপমারা গ্রামের ইদ্রিস মিয়ার (৪০) এক একর ও সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুর রবের ৭ একর জমির ধান ডুবে গেছে। আনচাবিলের পাড়ে পলিথিনের চটের ওপর ভেজা ধান শুকাতে দিয়েছেন তারা। শুকাতে দেওয়া ধান তিন-চার দিন ধরে স্তূপ করে রাখা ছিল। এতদিন রোদ না থাকায় ধান শুকানো যায়নি। চোখের সামনে জমির ধান তলিয়ে গেলেও তারা অসহায় বলে জানালেন এই দুই কৃষক।

খালিয়াজুরী উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের বর্গা চাষি জলিল মিয়া (৫৭)। এবার হাওড়ে ৩ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে চার বিঘা জমির ফসল অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন বর্গাচাষি জলিল পড়েছেন বিপাকে। দেনা শোধ আর বাকি বছর পরিবার-পরিজন নিয়ে কিভাবে চলবেন, এই চিন্তায় দিশাহারা তিনি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তার তালিকা করা হলেও জমি না থাকায় তার নাম নেই তালিকায়। জমির ধান গোলায়ও তুলতে পারেননি, আবার ধারদেনা শোধ করারও এখন আর কোনো উপায় নেই। জমি আবাদের সময় প্রতিবছরই খরচ জোগাতে দেনা করতে হয়। বৈশাখে ধান তুলে সেই ধান বিক্রি করে দেনা শোধ করা হয়। এবার নিজের ঘরের খোরাকি নাই, দেনা শোধ করবেন কিভাবে।

সরকারি তথ্য

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় জানায়, জেলায় ১ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর খেতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাওড়ে ৪২ হাজার হেক্টর খেতে বোরো আবাদ হয়। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

তবে স্থানীয় লোকজনের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর কয়েকগুণ বেশি। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, জেলার ৭০ হাজার কৃষকের প্রায় ২২ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হয়েছে; যার বাজার মূল্য ৩১৩ কোটি টাকা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য

নেত্রকোনার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, কংস উব্দাখালী, সোমেশ্বরী, ধনুসহ সব নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। আশা করা হচ্ছে পানি আরও কমে যাবে।

সরকারি সহায়তা

নেত্রকোনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল হক বলেন, প্রতিটি এলাকার কৃষকের অনেক ক্ষতি হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষকদের সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে তিন মাস খাদ্য সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।