জাপানের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট সাধারণ সিগারেটের চেয়ে দশ গুণ বেশি ক্ষতিকারক। এই তথ্যের আলোকে বাংলাদেশে ই-সিগারেটের বেচাকেনার ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করা হচ্ছে এবং অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের দাবি জানানো হচ্ছে।
ই-সিগারেটের স্বাস্থ্যঝুঁকি
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়ার কোনো কার্যকর বা নিরাপদ বিকল্প নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেও দেখা যাচ্ছে, ই-সিগারেটে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা তরুণেরা পরবর্তীকালে আরও ভয়াবহ ক্ষতির পথে এগিয়ে যায়। তরুণদের টক্সিক বিনোদনের পথে ঠেলে দেওয়ার অধিকার জাতীয় নেতাদের বা নীতিনির্ধারকদের থাকার কথা নয়। এখানে বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হওয়া উচিত।
গবেষণার ফলাফল
গবেষণায় দেখা গেছে, ই-সিগারেট ব্যবহারের ফলে ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ এবং বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রজনিত জটিলতা বৃদ্ধি পায়। এমনকি তথাকথিত ‘নিকোটিন-মুক্ত’ ই-সিগারেটেও ক্ষতিকর উপাদান বিদ্যমান, যা দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ই-সিগারেটে নিকোটিনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা মানবদেহে দীর্ঘ মেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
নিকোটিনের প্রভাব
নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তিকর এবং বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করে। এ বিষয়ে সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের সতর্কতাও সুস্পষ্টভাবে বিবেচনা করতে হবে।
তরুণ প্রজন্মের ওপর প্রভাব
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ই-সিগারেট তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে বাজারজাত করা হচ্ছে। আকর্ষণীয় ফ্লেবার, ডিজাইন এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক তথ্য বলছে, লাখ লাখ তরুণ ইতিমধ্যে এর ওপর আসক্ত হয়ে পড়েছেন। এটি শুধু একটি পণ্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার এক বিষাক্ত প্রবণতা। এ ছাড়া ই-সিগারেটকে অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য মাদকের ‘গেটওয়ে’ বা প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তরুণেরা পরবর্তীকালে প্রচলিত তামাকজাত পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে এটি ধূমপান নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে নতুন করে ভিন্ন পথে আসক্তির বিস্তার ঘটাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আরও উদ্বেগজনক। দেশে তামাক ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষতির ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পরিবার এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় নতুন নিকোটিনজাত পণ্যের বিস্তার জনস্বাস্থ্যসংকটকে আরও গভীর করবে।
কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি
এই প্রেক্ষাপটে আমরা মনে করি, ই-সিগারেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার অবিবেচনাপ্রসূত ও জনস্বাস্থ্যবিরোধী, অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি—ই-সিগারেটের ওপর পূর্বের নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে হবে। তরুণদের লক্ষ করে সব ধরনের বিজ্ঞাপন ও বিপণন কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। নিকোটিনজাত পণ্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন আরও কঠোর করে এই ক্ষতিকর পণ্যের বিস্তার রোধ করতে হবে।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একটি সুস্থ ও সচেতন প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে এই ধরনের ক্ষতিকর পণ্যের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। অন্যথায় সরকার জনস্বাস্থ্য রক্ষায় পরিবর্তে বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হবে। এর সঙ্গে কোনো আপস হতে পারে না। আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শুভ বুদ্ধির জয় হবে এবং এই জাতীয় স্বার্থবিরোধী চিন্তামুক্ত হবেন নীতিনির্ধারকেরা।



