রোদ ফিরতেই হাওরে ধান শুকানোয় ব্যস্ত হয়ে উঠেছে হাওরের কৃষি পল্লী। কৃষকের মধ্যে ফিরেছে কিছুটা স্বস্তি। দুই দিন ধরে বৃষ্টিপাত কমে আসায় নদনদীর পানিও নামতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বেশির ভাগ পয়েন্টে পানি কমছে। আমাদের খালিয়াজুরী (নেত্রকোনা) সংবাদদাতা জানান, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার হাওরাঞ্চলে বোরো মৌসুমে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। বহু খেতের ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে কাটা ধানের একটি বড় অংশ খোলা আকাশের নিচে ভিজে থাকায় কৃষকরা আরো বড় ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে কয়েক দিনের রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া হাওরের কৃষকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। রোদ উঠতেই ধান শুকানোর কাজে মাঠে নেমে পড়েন কৃষক। খোলা মাঠ, বাড়ির আঙিনা, সড়কের ধারে ও উঁচু জায়গায় ধান মেলে দ্রুত শুকিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
ক্ষতির মুখে কৃষকরা
খালিয়াজুরী সদর এলাকার কৃষক মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘সাত একর জমিতে আবাদ করেছিলাম। এর মধ্যে এক একর পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ১৫ দিন আগে বাকি ছয় একরের ধান কেটে ফেলেছিলাম। প্রতি একরে আবাদ, কাটা ও মাড়াই মিলিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে পারিনি। এখন রোদ ওঠায় দ্রুত শুকানোর চেষ্টা করছি।' আরেক কৃষক সোহান-বিন-নবাব বলেন, 'ক্ষতি অনেক হয়েছে। তার পরও যেটুকু ধান বাঁচানো সম্ভব, সেটাই বাঁচাতে চেষ্টা করছি। এই রোদ আমাদের জন্য অনেক দরকার ছিল।'
কৃষি বিভাগের পরামর্শ
স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানায়, হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে বর্তমান রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া অবশিষ্ট ধান রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে। কৃষকদের দ্রুত ধান শুকিয়ে নিরাপদে সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, ‘উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর আবাদি জমির প্রায় ৪০ শতাংশ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।'
কিশোরগঞ্জে পানি কমলেও শঙ্কা
নিকলী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, দুই দিন ধরে বৃষ্টিপাত কমে আসায় কিশোরগঞ্জের নদনদীর পানি নামতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বেশির ভাগ পয়েন্টে পানি কমলেও একটি পয়েন্টে সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। টানা বৃষ্টির পর রোদ ওঠায় হাওরাঞ্চলে ফিরেছে স্বস্তি। ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। বুধবার দুপুরে কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, জেলার ইটনা পয়েন্টে ধন-বৌলাই নদীর পানি কমে ৩.২৮ মিটারে নেমেছে, যা আগের দিনের তুলনায় দুই সেন্টিমিটার কম। চামড়াঘাটে মেঘনা ও নিকলীর গোড়াউত্রা নদীর পানি রয়েছে ২.৯৫ মিটার, কমেছে এক সেন্টিমিটার। ভৈরব বাজারে মেঘনা নদীর পানি কমে ১.৬৪ মিটারে দাঁড়িয়েছে। এখানে পানি সাত সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি বেড়ে ২.৬৫ মিটারে পৌঁছেছে। এখানে পানি তিন সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে জেলার সব নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৮৭ থেকে ৪১৬ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। তবে উজানের পানির চাপ ও বৃষ্টিপাত আবার বাড়লে নদনদীর পানি পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
কৃষকদের ব্যস্ততা
মঙ্গলবার সকাল থেকে আকাশ পরিষ্কার হয়ে রোদ ওঠায় হাওর জুড়ে ফিরে আসে কর্মচাঞ্চল্য। ডুবে যাওয়া খেত ও খলায় স্তূপ করে রাখা ধান রক্ষায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। বুধবার সকাল থেকেই রোদ থাকায় সেই ব্যস্ততা অব্যাহত রয়েছে। কেউ পানি থেকে ধান তুলছেন, কেউ আবার খলায় রাখা ধান শুকাচ্ছেন। এক সপ্তাহ আগে ধানমাড়াই করেছিলেন। নিকলীর সিংপুর গ্রামের কৃষক মোস্তফা মিয়া (৫৫)। সেই ধান স্তূপ করে খলায় রেখেছিলেন। টানা বৃষ্টির কারণে ধান আর শুকাতে পারেননি। ধানে এখন অঙ্কুর গজিয়েছে। গত দুই দিন থেকে রোদ ওঠায় সেই ধান খলায় শুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। তার সঙ্গে কাজে যোগ দিয়েছেন স্ত্রী ও দুই ছেলে। কৃষক মোস্তফা মিয়া জানান, 'এই ধানের সব কামে আইত না। তবু রইদ ওঠায় রক্ষা। আমরা লাখান (মতো ) অনেক মানুষের ধান খলাত নষ্ট অইছে।' জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ তথ্যমতে বুধবার প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর বোরো জমি পানিতে তলিয়ে ৫০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।



