বেশ কিছুদিন পর গতকাল মঙ্গলবার কড়া রোদ উঠলে সিলেট অঞ্চলের কিষান-কিষানির মনে কিছুটা আনন্দ পরিলক্ষিত হয়। তারা কিছুটা ভিজা ধান শুকাতে পেরেছেন। কিন্তু দুশ্চিন্তা দূর হয়নি। নদীর পানি বাড়ছে। হাওর রক্ষা বাঁধেও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়ার খবরে বৃষ্টির আভাস রয়েছে। মূলত সিলেটের বোরো ফসল এখনো ঝুঁকিতে।
অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ বছরের এপ্রিল মাসে বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিক প্রবণতা ছিল। গেল এপ্রিলে সিলেটে মোট ৬০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়—যা স্বাভাবিকের তুলনায় গড়ে ১০৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। সাধারণত এ সময় ভারতের উজান এলাকায় বেশি বৃষ্টিপাত হলেও এবার তার বিপরীতে বাংলাদেশে বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে বেশি পরিমাণে বৃষ্টিপাত হয়েছে। চলতি মে মাসেও আবহাওয়ায় ভিন্নতা থাকতে পারে। বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে যা সিলেটের কৃষকদের জন্য উদ্বেগের কারণ। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, একই সময়ে গড়ে ১৩ দিন বৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বৃষ্টি হয়েছে ২৩ দিন। যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, সুনামগঞ্জে সুরমা মঙ্গলবার বিপত্সীমার ১১৩ সেন্টিমিটার নিচে ছিল।
ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যে কৃষকের লোকসান
সিলেট সরকারিভাবে ধান-চাল ক্রয় শুরু হলেও কৃষকদের মধ্যে তেমন সাড়া নেই। প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা সরকার নির্ধারণ করলেও কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণার অভাবে ফড়িয়ারা সুযোগ নিচ্ছেন। তারা খলা থেকে ভিজা ধান কিনছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে। এ পর্যায়ে কৃষকরা মারাত্মকভাবে লোকসানে পড়েছেন। মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে খলাতেই কম দামে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন। সুনামগঞ্জের দেখার হাওরপাড়ের গোবিন্দপুর গ্রামের দুই সহোদর এমরান মিয়া ও সামরান মিয়া ধারদেনা করে ১৭ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হলেও এখনো পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি তারা। তাদের মধ্যে ১০ বিঘার ধান কোনোভাবে কেটে খলায় তুললেও বাকি ৭ বিঘা জমি এখনো পানির নিচে। জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে হারভেস্টার নামানো সম্ভব হয়নি, আবার শ্রমিকের সংকটও দেখা দিয়েছে। ফলে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে দুই ভাইয়ের।
কৃষকের বক্তব্য
এমরান মিয়া বলেন, ‘ধান চাষে অনেক খরচ হয়েছে। এবার লাগাতার রোদ না থাকায় বিপদ হয়েছে। বেপারীরা কম দাম বলছে, বাধ্য হয়ে বিক্রি করে দিচ্ছি’—এমন চিত্র সিলেটের প্রতিটি হাওর এলাকায়। জলিলপুর গ্রামের কৃষানি রংমালা বিবি বলেন, ধান ভেজা অবস্থায় খলাতেই নষ্ট হচ্ছিল। এর মধ্যে কিছু ধান শুকালাম। কিন্তু বেপারীরা প্রতি মণ ৭০০ টাকার ওপরে দেয় না। অনেকেই বলেন, সরকারি ধান ক্রয় অভিযান এবং দামের বিষয়টি ভালোভাবে প্রচার হলে কৃষক ঠকবেন না। তবে জেলা খাদ্য বিভাগ বলছে, কৃষকদের সচেতন করতে মাইকিংসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি ধান সংগ্রহ ও কৃষি বিভাগের তথ্য
সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বি এম মুশফিকুর রহমান জানান, এ বছর জেলায় ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকরা লোকাল সাপ্লাই ডিপোতে ধান এনে শুকিয়ে সরাসরি সরকারি গুদামে দিতে পারবেন। আমরা সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করছি। কর্মকর্তারা বলেন, ধানের আর্দ্রতা ১৪ শতাংশের মধ্যে থাকলে ধান ক্রয় করা হবে। এজন্য নমুনা পরীক্ষাও বাধ্যতামূলক। এবার সুনামগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩৭৩ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট আবাদের ৬৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৯৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, অন্য এলাকায় ১৯ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। জেলায় প্রায় ২০ হাজার ১৬০ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়। কৃষি বিভাগ জানায়, হাওর অঞ্চলে এখনো প্রায় ২৫ শতাংশ পাকা ধান পানির নিচে যা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, আবহাওয়া অপরিবর্তিত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে এলে নন-হাওর এলাকার পাকা ধান দ্রুত কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হবে।



