সুনামগঞ্জ জেলায় অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুত মানবিক সহায়তা প্রদান ও হাওড়ের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মঙ্গলবার (৫ মে) একসঙ্গে সুনামগঞ্জ জেলায় আসেন। দুপুরে তারা স্থানীয় সার্কিট হাউসে জেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দলীয় নেতা ও গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
ত্রাণমন্ত্রীর বক্তব্য
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, এ সরকার জনবান্ধব। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা একটা বৃহৎ টিম একসঙ্গে সুনামগঞ্জে এসেছি। সুনামগঞ্জের হাওড় ও হাওড়ের কৃষকদের অবস্থা দেখার লক্ষ্যেই এখানে আসা। হাওড়ের ফসলহানিতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হাওড়ের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নির্ভুল তালিকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এ কমিটিতে সংসদ সদস্যরা থাকবেন উপদেষ্টা হিসেবে। সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষর পেলেই তালিকা গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের বোরো ফসল রক্ষায় প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এতে বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় বাঁধ দিয়ে জনগণের টাকা অপচয় করা হয়। টাকা যাতে এদিক সেদিক না হয় এজন্য হাওড় রক্ষা বাঁধ নিয়ে গবেষণা করতে হবে। হাওড়ে বৃষ্টি কিংবা বন্যার পানিতে ধান ডুবে যায়। হারভেস্টার মেশিন দিয়েও কাটা যায় না। বহির্বিশ্বের সঙ্গে কথা বলে ডুবন্ত ধান কিভাবে কাটা যায়, ভেজা ধান কিভাবে শুকানো যায়-সেটা আমরা জানার চেষ্টা করব।
তিনি আরও বলেন, সুনামগঞ্জে বেশি বেশি বজ্রপাত হয়। কৃষকের প্রাণহানি হয়। গবাদিপশুও মারা যায়। বজ্রপাত ঠেকাতে হাওড়ে শেড ঘর (শেল্টার হাউস) নির্মাণ করা হবে। এ শেড ঘরের উপরে বজ্রদণ্ড বসানো হবে। বিরূপ আবহাওয়ায় এতে সাইরেন বাজবে।
কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, বর্তমান সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে বাংলাদেশের কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। তিনি বলেন, সুনামগঞ্জের হাওড়াঞ্চলের মানুষ যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, ভবিষ্যতে যেন তাদের আর এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়, সেজন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, আমাদের দেশে যে পরিমাণ সার ব্যবহার করা হয়, তা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি যা দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। আমরা এই মাটির সমস্যা সমাধানে কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে কৃষি ও কৃষকদের ক্ষতি এড়াতে জলাবদ্ধতা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং বাঁধ নির্মাণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে সমন্বিত করে একটি মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। কারণ পরিবেশ ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। তাই হাওর অঞ্চলের বাঁধগুলো এমনভাবে নকশা করতে হবে, যাতে কৃষি ও কৃষকের কোনো ক্ষতি না হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার বক্তব্য
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তীতুমীর বলেন, এ বছর হাওড়াঞ্চলে অতি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যার ফলে ফসলডুবির ঘটনা ঘটেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এ ধরনের দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের হাওড় ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। হাওড়ের বাঁধ, সেচ প্রকল্প, ধান চাষ এবং সামগ্রিক ইকোসিস্টেম বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি হাওড় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় শুধুমাত্র প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিরাই অন্তর্ভুক্ত হবেন। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাবে না। তিনি আরও বলেন, ধান পচে গেলে পানিতে এমনিয়া হয়। এতে হাওড়ে মাছ আক্রান্ত হয়। এই ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। হাওরে যে ক্ষতি হয়েছে তা বৈজ্ঞানিকভাবে ও দেশীয় পদ্ধতিতে নিরূপণ করতে হবে।
তথ্য উপস্থাপন ও বিরোধিতা
অনুষ্ঠানের শুরুতে সুনামগঞ্জের হাওড়ে ফসলের ক্ষয়-ক্ষতির সার্বিক তথ্য প্রজেক্টরের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক। তার দেওয়া তথ্যের তীব্র বিরোধিতা করেন সভায় উপস্থিত রাজনৈতিক নেতা, কৃষক সংগঠনের নেতা ও গণমাধ্যম কর্মীরা। তারা বলেন, এসব তথ্য মনগড়া। এসব তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই।
সভাপতির বক্তব্য ও মানবিক সহায়তা বিতরণ
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফুর রহমানের সভাপতিত্বে এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন- সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম নুরুল, সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল, জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান চৌধুরী।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সমর কুমার পালের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তীতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার।
মতবিনিময় সভা শেষে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত ৪শ কৃষকের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তা তুলে দেন ত্রাণ ও দুর্যোগমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। এ সময় জেলা প্রশাসনসহ অন্যান্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।



