বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ময়মনসিংহ স্যাটেলাইট স্টেশনের উদ্যোগে সদরের ভাবখালী ইউনিয়নের চকনজু গ্রামে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করে রাইস গার্ডেন তৈরি করা হয়েছে। সেখান থেকে কৃষকেরা পছন্দমতো ধানের জাত নিয়ে মাঠে চাষ করছেন। রোববার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠে মাঠে দুলছে সোনালি ধান। ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা। কোথাও কোথাও ধান কাটা শুরু হয়ে গেছে। মাঠের গবেষণা প্লট থেকে বিভিন্ন জাতের ধানের ফলন দেখে নিজেদের পছন্দের জাত বাছাই করে এই ধান চাষ করেছেন গ্রামের কৃষকেরা। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক চাষাবাদ ব্যবস্থায় এই ধান চাষ করা হয়েছে।
প্রযুক্তি গ্রাম হিসেবে চকনজু
গ্রামটির নাম চকনজু। সদর উপজেলার ভাবখালী ইউনিয়নের ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামে কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৩০০। ব্রির ময়মনসিংহ স্যাটেলাইট স্টেশনের উদ্যোগে ২০২৩ সাল থেকে এ গ্রামকে ‘প্রযুক্তি গ্রাম’ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। ‘স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং বিদ্যমান গবেষণার উন্নয়ন (এলএসটিডি)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় চলতি বোরো মৌসুমে গ্রামের ১৩৭ জন কৃষকের ৪৫ একর জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করা হয়েছে।
কৃষকের অভিজ্ঞতা
চকনজু গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম ২৬ শতক জমিতে ‘ব্রি হাইব্রিড ১০৮’ জাতের ধান চাষ করেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন আবিষ্কারের ধান ভালো হয়েছে। মেশিন দিয়ে আমাদের ধান লাগিয়ে দিয়েছে। সার, ওষুধ—সব দিয়েছে। প্রদর্শনীতে বিভিন্ন জাতের ধান আছে। সেখান থেকে যেটা ভালো ফলন হয়, পছন্দ করে সেটাই আমরা রাখছি। এতে আমাদের জন্য ভালোই হচ্ছে।’
আরেক কৃষক জমশেদ আলীর কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা ৫৫ বছরের। তিনি বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে ধান গবেষণা থেকে যে বীজ, সার, কীটনাশক পাচ্ছি, এটা দিয়ে ফলন বেড়ে গেছে। গেল বছর ১০৮ জাতের ধান ৫ মণ মাড়াই করেছি। এইবারও এই ধান করছি। আগে যে জাতের ধান করতাম, তা তিন থেকে সাড়ে তিন মণ হতো।’
রাইস গার্ডেন ও গবেষণা প্লট
রোববার দুপুরে সরেজমিন ফসলের মাঠে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। সেখানে ব্রির নিজস্ব গবেষণা প্লটও আছে। ব্রি উদ্ভাবিত ১২৩টি ধানের জাতের মধ্যে বোরো মৌসুমের ৬১টি জাত এখানে চাষ করা হয়েছে। বিআর ১ চান্দিনা, বিআর ২ মালা, বিআর ১৪ গাজী, বিআর ১৫ মোহিনী, বিআর ১৬ শাহিবালাম, বিআর ১৭ হাসিসহ নানা ধরনের জাত। একই মাঠে ৬১টি ধানের জাত নিয়ে স্থাপিত বিশেষ ‘রাইস গার্ডেন’ থেকে চাষিরা দেখছেন কোন ধানটি তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে এবং সেই অনুযায়ী নিজেরাও চাষ শুরু করছেন। এখানে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান রোপণ ও স্থানভিত্তিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে গবেষণা কার্যক্রমও চলছে।
মাঠ দিবসের উদ্বোধন
আজ কৃষক জমশেদ আলীর জমিতে ফসল কাটা ও মাঠ দিবসের উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। পরে মীর্জা পার্কে মাঠ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সভায় তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কৃষকবান্ধব। ময়মনসিংহের কৃষকদের বিশেষভাবে কৃষি কার্ড দেওয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছেন। দ্রুত কৃষকদের হাতে এই কার্ড পৌঁছে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট দূরে হওয়ায় ময়মনসিংহের কৃষকেরা নতুন জাতগুলো দেরিতে পেতেন বা অনেক সময় পেতেনই না। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ময়মনসিংহে একটি স্যাটেলাইট স্টেশন তৈরি করা হয়েছে।
প্রকল্পের উপপরিচালক ও ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আফছানা আনছারী বলেন, ‘এই প্রকল্পের মাধ্যমে একটি গ্রামকে পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলার কাজ চলছে। চকনজু গ্রামকে আমরা প্রযুক্তি গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলছি। গ্রামের প্রত্যেক কৃষককে আর্থিক, বীজ ও কীটনাশক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিক স্বল্পতা থাকায় গ্রামের বেশির ভাগ জমি যন্ত্রপাতির মাধ্যমেই চাষ করা হয়েছে।’
আফছানা আনছারী আরও বলেন, ‘কৃষকেরা “রাইস গার্ডেন” দেখে নিজেদের জন্য উপযোগী জাত পছন্দ করতে পারবেন। কারও হয়তো ফলন বেশি প্রয়োজন, কারও হয়তো চিকন ধান পছন্দ—সব বিষয় মাথায় রেখেই প্রদর্শনীতে জাতগুলো রাখা হয়েছে। সাধারণত বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কৃষকদের এত যোগাযোগ থাকে না। কিন্তু তারা কৃষকদের কাছে গিয়ে তাদের সমস্যার কথা শুনছেন। এরপর গবেষণা করে তারা কৃষকদের নতুন ধান দিচ্ছেন।’ এখান থেকে যে ধানটি কৃষকদের ভালো লাগবে, তারা সেটাই চাষ করতে পারবেন। একটি গ্রামকে যে একটি গবেষণা মাঠ বানানো যায়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে তারা সেটিই করে দেখাচ্ছেন।



