ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে সব ধরনের মাছ ধরার ওপর টানা দুই মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) মধ্যরাতে। এতে স্বস্তি ফিরেছে কর্মহীন থাকা ভোলার সাত উপজেলার প্রায় দুই লাখ জেলের মুখে। অন্যদিকে নদী তীরবর্তী মাছের আড়তগুলো ক্রেতা-বিক্রেতার চিরচেনা হাঁকডাকের অপেক্ষায় প্রস্তুত হচ্ছে। শেষ মুহূর্তে ধোঁয়ামোছার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন আড়তদাররা। নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা ও লক্ষ্য
জেলা মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মার্চ-এপ্রিল মাসজুড়ে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছিল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দিনগত রাত ১২টায়। এটি শেষ হচ্ছে আজ বুধবার (৩০ এপ্রিল) দিনগত রাত ১২টায়। নিষেধাজ্ঞার আওতায় ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ ছিল।
জেলেদের সংখ্যা ও সহায়তা
ভোলা মৎস্য বিভাগের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ভোলার সাত উপজেলায় মোট নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৯৭০ জন। এর মধ্যে ভোলা সদর উপজেলায় ২২ হাজার ৪১২ জন, দৌলতখানে ২১ হাজার ২৯৩ জন, বোরহানউদ্দিনে ১৯ হাজার ৮৩৮ জন, লালমোহনে ২৪ হাজার ৮০৬ জন, তজুমুদ্দিনে ১৯ হাজার ৫৭২ জন, চরফ্যাশনে ৪৪ হাজার ৩১২ জন ও মনপুরা উপজেলায় ১৫ হাজার ৭৩৮ জন। সরকার তাদের অনুকূলে মাসে ৪০ কেজি করে ৯০ হাজার ২০০ জেলে পরিবারকে ভিজিএফ চাল দিয়েছে। এছাড়া এবারই প্রথম ইলিশ সম্পদ প্রকল্পের আওতায় ১৩ হাজার ৬০০ জন জেলেকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে।
জেলেদের প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা
সরেজমিনে সদর উপজেলার ভোলার খাল ও তুলাতুলি মেঘনা তীরে ঘুরে দেখা যায়, মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার খবরে জাল-ট্রলার মেরামতসহ মাছ ধরার সব সরঞ্জাম প্রস্তুত করে রেখেছেন জেলেরা। কেউ কেউ শেষ মুহূর্তে জাল-ট্রলার মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
জেলে মো. গিয়াসউদ্দিন, শাজাহান, বশির ও জোবায়ের বলেন, দুই মাসের নিষেধাজ্ঞায় কর্মহীন হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটিয়েছেন। তারপরও সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ ধরতে নামেননি। সরকারি খাদ্য সহায়তার চাল ছিল চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। মাছ ধরা ছাড়া তাদের আর কোনো পেশা নেই। আজ মধ্যরাতে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে, তাই নদীতে গিয়ে মাছ ধরার সব প্রস্তুতি নিয়েছেন। রাত ১২টার পর নদীতে নামবেন। আশা করছেন ইলিশসহ সব ধরনের মাছ পেয়ে তা বিক্রি করে বিগত দিনের দেনা শোধ করতে পারবেন। তবে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেলে দুর্দশার শেষ হবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
আড়তদারদের প্রস্তুতি
নদীতে নিষেধাজ্ঞায় নিজেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জানিয়ে আড়তদার ইউনুছ বেপারী বলেন, ঢাকা-খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে দাদন (টাকা) এনে জেলেদের দিয়েছিলেন। নিষেধাজ্ঞার কারণে জেলেরা মাছ ধরতে পারেননি, ফলে আড়ত বন্ধ রাখতে হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে আশা করছেন জেলেরা আড়তে মাছ এনে বিক্রি করবেন, যা দিয়ে দেনা শোধ হবে। তাই আড়ত খুলে কেনাবেচার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। জেলেরা নদীতে কাঙ্ক্ষিত মাছ পেলে সবাই লাভবান হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নিষেধাজ্ঞা সফল হয়েছে: মৎস্য কর্মকর্তা
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, সীমিত জনবল ও অর্থ বরাদ্দের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আশা করছেন ১ মে থেকে জেলেরা নদীতে গিয়ে ইলিশসহ সব ধরনের কাঙ্ক্ষিত মাছ পাবেন। নিষেধাজ্ঞার ফলে মাছের উৎপাদন বাড়বে, এতে দেশ ও জাতি লাভবান হবে। এছাড়া এবারই প্রথম ইলিশ সম্পদ প্রকল্পের আওতায় জেলেদের বিভিন্ন ধরনের সরকারি খাদ্যসামগ্রীসহ ভিজিএফ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।



