সুনামগঞ্জে বৃষ্টি কমলেও হাওড়ের ফসলের অবস্থা শোচনীয়, কৃষকের দুর্ভোগ চরমে
সুনামগঞ্জে বৃষ্টি কমলেও হাওড়ের ফসলের অবস্থা শোচনীয়

সুনামগঞ্জের হাওড় অঞ্চলে প্রায় চার-পাঁচ দিনের ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে কৃষকের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে হাওড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসল ডুবে গেছে। নদীতেও পানি বেড়েছে। ইতোমধ্যে জেলার মধ্যনগর উপজেলায় দুটি বাঁধ ভেঙে হাওড়ে পানি ঢুকে ব্যাপক ফসলহানি ঘটেছে।

রোদ দেখা দিলেও শঙ্কা কাটেনি

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বৃষ্টিপাত বন্ধ রয়েছে। দুপুরের পর থেকে প্রায় সপ্তাহখানেক পর হাওড়াঞ্চলে রোদের দেখা মিলেছে। তবে এই রোদ কতক্ষণ স্থায়ী হবে তা নিশ্চিত নয়। কৃষকদের স্বপ্নের ফসল এখন পানির নিচে। তারা জানিয়েছেন, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে পানির নিচ থেকে ফসল ভেসে উঠতে আরও কমপক্ষে এক সপ্তাহ লাগবে। ইতিমধ্যে পাকা ও আধাপাকা ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ব্যাপক।

দ্বৈত সংকটে কৃষক

বর্তমানে হাওড়ের কৃষকরা দুই ধরনের দুর্ভোগের মুখোমুখি। হাওড়ে অতিরিক্ত পানি থাকায় হারভেস্টার মেশিন কাজ করছে না। অন্যদিকে, পানিতে নেমে ধান কাটতে শ্রমিকরা আগ্রহী নন। যেসব শ্রমিক ধান কাটতে রাজি, তাদের দ্বিগুণ মজুরি দিতে হচ্ছে। এ কারণে পাকা ধান কাটা নিয়ে কৃষকরা মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন। যারা বেশি টাকা দিয়ে শ্রমিক এনে ধান কেটেছেন, তাদের ধান শুকাতে না পারায় ধানের মধ্যে চারা গজিয়ে গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেখার হাওড়পাড়ের কৃষক রবিউল বলেন, "এবার ফসল নিয়ে আমরা মহাবিড়ম্বনায় পড়েছি। প্রথম দিকে বৃষ্টিতে আমাদের কাঁচা ও আধাপাকা ধান তলিয়ে যায়। পরে ধান পাকার শুরুতেই আবার বৃষ্টি। এখন পাকা ধানও পানির নিচে। কী করব বুঝতে পারছি না। সামনে অন্ধকার দেখছি।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষি বিভাগের তথ্য

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক জানান, মধ্যনগরের এরন বিল ও জিনারিয়া বাঁধ ভেঙেছে। এই বাঁধগুলো বড় হাওড়ের না হলেও তিনটি ছোট হাওড়ে পানি ঢুকেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, হাওড়ে ১৩ হাজার ৭৯ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে এবং দুই হাজার ৪৭ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫১ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। এ বছর সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওড়ে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। বুধবার পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৮১১ হেক্টর। তিনি আরও জানান, আরও চার-পাঁচ দিন পর পুরো ক্ষতির চিত্র পাওয়া যাবে।

কৃষকদের দাবি ভিন্ন

তবে কৃষি বিভাগের তথ্যের সঙ্গে একমত নন কৃষক ও তাদের সংগঠনগুলো। সুনামগঞ্জ হাওড় ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, "কৃষি অধিদপ্তর মনগড়া তথ্য দিচ্ছে। সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার মধ্যে দোয়ারাবাজার ছাড়া সবকটি উপজেলার ধান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।" তিনি জানান, চলমান সংকটে হাওড়ের ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ধান এখনো পানির নিচে। তিনি আরও বলেন, "আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কিছু ধান তোলা সম্ভব; কিন্তু আবার বৃষ্টি শুরু হলে সব ধান বিনষ্ট হবে।"

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, "দুই দিন বৃষ্টি কম হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে। বৃহস্পতিবার রোদ ওঠায় কৃষকেরা ধান কাটা ও মাড়াইয়ে সুবিধা পাবেন।" তবে তিনি এ আবহাওয়া অব্যাহত থাকবে কিনা তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় সুনামগঞ্জের সব বালুমহাল আরও পাঁচ দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। এর আগে ২০ এপ্রিল থেকে ১০ দিনের জন্য সব বালুমহাল বন্ধ ছিল। বৃহস্পতিবার জেলার রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর এসএম ইয়াসীর আরাফাত স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বোরো ধান কাটার মৌসুমে ব্যাপক শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। বোরো ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য এবং সময়মতো ঘরে তোলা অত্যন্ত জরুরি। তাই ২০ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বালু উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু ধান কাটা শেষ না হওয়ায় আগামী ৫ মে পর্যন্ত বালুমহালে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকবে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রশাসনের এই ঘোষণা শ্রমিক সংকট মোকাবেলায় সহায়ক হবে বলে কৃষকরা মনে করছেন।