মৌলভীবাজারে টানা কয়েক দিনের হালকা ও ভারী বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অনেক স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন হাওরে পানি বেড়েছে। এতে হাওরের নিচু এলাকার ধানের খেত তলিয়ে যাওয়ায় ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকেরা।
নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি
বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার নদ-নদীগুলোতে পানি বেড়েছে। ইতিমধ্যে জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে অন্যান্য নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
আবহাওয়ার অবস্থা
আবহাওয়া কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে মৌলভীবাজারে ঝড়ের সঙ্গে হালকা ও ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এতে মৌলভীবাজার জেলা শহরে খাল-নালা উপচে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। নিচু এলাকার অনেক বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও সড়কে পানি উঠেছে। অন্যদিকে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার নদ-নদী এবং হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরে পানি বাড়ছে। আজও সকাল থেকে আকাশ মেঘলা। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। কর্মজীবী মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ বেড়েছে।
বৃষ্টিপাতের পরিমাণ
জেলার শ্রীমঙ্গলের আবহাওয়া কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ছয়টা থেকে আজ বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত মৌলভীবাজারে ৪২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ২৫ এপ্রিল সকাল ছয়টা থেকে ২৬ এপ্রিল সকাল ছয়টা পর্যন্ত ৩০ মিলিমিটার এবং ২৬ এপ্রিল সকাল ছয়টা থেকে ২৭ এপ্রিল সকাল ছয়টা পর্যন্ত ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়।
ফসলের ক্ষতি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পাউবো ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার ও উজানে কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হওয়ায় মনু, ধলাইসহ জেলার প্রধান নদ-নদীতে পানি বাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে জেলার হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরেও পানি বেড়েছে। হাওরগুলোর নিচু অংশের অনেক জমির পাকা ও আধা পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যায়। তবে কৃষকেরা পাকা ধান অনেকটাই কেটে ফেলেছেন। গতকাল বিকেলেও সদর উপজেলার বিরইমাবাদ এলাকার হাওরাঞ্চলে পানির মধ্য থেকে কৃষকদের ধান কাটতে দেখা যায়। এদিকে কাউয়াদীঘি হাওরে মনু নদ সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউসের মাধ্যমে সেচ প্রদান অব্যাহত আছে।
নিমজ্জিত জমির পরিমাণ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আজ নতুন করে জেলার হাওরাঞ্চলে প্রায় সাড়ে ৩০০ হেক্টর জমি নিমজ্জিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ১৭২ হেক্টর সবজিখেত নিমজ্জিত হয়েছে। প্রায় ১৬ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা প্রাথমিকভাবে নিমজ্জিত হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজারের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন আজ প্রথম আলোকে বলেন, হাওরে আজ কিছুটা পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৩০০ হেক্টর ফসলের খেত নিমজ্জিত হয়েছে। তবে হাওরে এখন পর্যন্ত ৮২ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে। অন্যদিকে হাওরাঘেঁষা অঞ্চলে সবজিখেতের মাচা নিমজ্জিত হয়েছে। বৃষ্টি কমলে এগুলো ভেসে উঠবে। প্রাথমিকভাবে আউশের কিছু বীজতলা নিমজ্জিত হয়েছে। তবে এখনো বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
পাউবোর তথ্য
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জেলার নদ-নদীতে পানি বেড়েছে। তবে একমাত্র জুড়ী নদী ছাড়া অন্য সব নদ–নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হাকালুকি হাওর পানিতে ভরে গেলে জুড়ী নদীতে পানি প্রায় সারা বর্ষাই বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আজ দুপুর ১২টায় জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে মনু নদের পানি রেলওয়ে ব্রিজের কাছে বিপৎসীমার ৩০৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে, মৌলভীবাজার শহরের কাছে চাঁদনীঘাটে ১২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কমলগঞ্জে ধলাই নদের রেলওয়ে ব্রিজের কাছে আজ দুপুর ১২টায় ২৪০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর পানি শেরপুরে বিপৎসীমার ২৪৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য
পাউবোর মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ আজ প্রথম আলোকে বলেন, জেলার কোথাও কোনো বন্যা পরিস্থিতি নেই। নদ-নদীতে পানি বাড়ছিল, তবে এখন কমছে। জুড়ী নদী ছাড়া মনু, ধলাই ও কুশিয়ারা নদ–নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হাওরে পানি বেড়েছে। কাউয়াদীঘি হাওরে সেচপাম্প চালু আছে। এখনো বাড়িঘরে পানি ওঠার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।



