আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাইছিলাম, আমার মানিকটারে রাখার জন্য—তবুও আমার মানিকটারে নিয়া গেল গা, কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা সোনিয়া। সাত মাস বয়সী ছেলে তাসমিদকে বাঁচাতে একের পর এক হাসপাতালে ছুটেছেন এই মা। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত কাশি, জ্বর আর হাম কেড়ে নিল তার একমাত্র সন্তানকে। ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে পড়েছেন এই মা।
শুরু হয়েছিল ঠাণ্ডা-কাশি দিয়ে
সোনিয়া জানান, রমজানের মাঝামাঝি সময় থেকেই তাসমিদের ঠাণ্ডা ও কাশি শুরু হয়। প্রথমে পরিচিত এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে ওষুধে কিছুটা সেরে ওঠে। কিন্তু, এক সপ্তাহ না যেতেই আবার কাশি ফিরে আসে। এরপর নিকটস্থ একটি প্রাইভেট হাসপাতালে দেখানো হলে চিকিৎসক ওষুধ দেন এবং জানান, কাশি বেশি বাড়লে ইনজেকশন দিতে হবে, আর কম থাকলে নেবুলাইজার দিলেই হবে।
বাসায় ফিরেও স্বস্তি মেলেনি
তাসমিদকে বাসায় এনে ওষুধ ও নেবুলাইজার দেওয়া হলে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। এর সপ্তাহখানেক পর থেকে তাসমিদের আবার কাশি শুরু হয়। কাশি বাড়তে থাকে, সঙ্গে বমি। কিছু খাওয়ালেই কাশি হতো, আর বমি করতো। কিছুটা সুস্থ হলেও ঈদের পর আবার শুরু হয় জ্বর, ঠাণ্ডা ও কাশি। জ্বর কমছিল না, বারবার ফিরে আসছিল।
হাসপাতালে ভর্তি ও অবস্থার অবনতি
অবস্থা বেশি খারাপ হলে গত ১২ এপ্রিল তাসমিদকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ছয়দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর কাশি কিছুটা কমলে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু, বাসায় ফেরার দুই-তিন দিনের মধ্যেই আবার কাশি শুরু হয়। শরীরে ঘামাচির মতো ফুসকুড়ি দেখা দিলে পরিবারের সন্দেহ হয়, তাসমিদের হাম হয়েছে। এরপর শুরু হয় হাসপাতাল ঘোরা। কেরানীগঞ্জের হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল—কোথাও খালি শয্যা মেলেনি।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শেষ চেষ্টা
শেষ পর্যন্ত ২৩ এপ্রিল তাসমিদকে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, তাসমিদের হাম ও নিউমোনিয়া হয়েছে। প্রথমে ওয়ার্ডে রাখা হলেও অবস্থার অবনতি হয়। পরে আইসিইউতে নেওয়া হয় তাকে। সোনিয়া বলেন, প্রথম কয়েকদিন কিছুটা সুস্থতার আভাস মিললেও ২৫ এপ্রিল দুপুর থেকে হঠাৎ করেই অবস্থার অবনতি ঘটে। মারা যাওয়ার দিন আমারে দেখলেই হাত বাড়ায়া ধরতো। শক্ত করে হাত ধইরা রাখতো। চোখ-মুখ কেমন জানি হইয়া গেছিলো। খাওনের জন্য মুখ হা করে রাখতো, বড় বড় কইরা তাকায় থাকতো। মনে হইতো বাঁচার জন্য কত কষ্ট করতেছে আমার বাবা।
শেষ মুহূর্ত ও মায়ের বিলাপ
রাতের দিকে শিশুটির অবস্থা আরও খারাপ হয়। রাত দেড়টায় না ফেরার দেশে চলে যান তাসমিদ। মা সোনিয়া বলেন, আমার চোখের সামনে দিয়েই আমার বাবাটার চোখ বন্ধ হয়ে গেল। আমি কিছু করতে পারলাম না। মা হয়ে শুধু অসহায়ের মতো তাকাইয়া থাকলাম। ছেলের জন্য মায়ের মমতা আর স্মৃতিগুলো এখন সোনিয়াকে কাঁদায় প্রতিটি মুহূর্তে। কান্না করতে করতে তিনি বলেন, আমার বাবা খুব শান্ত আছিলো। খাওন দিলে শান্তভাবে খাইতো, কোনও বিরক্ত করতো না। আমারে না ধরে ঘুমাইতো না। আমি কোলে না নিলে ঘুম হইতো না আমার মানিকটার। এখন আমার মানিক একা কীভাবে ঘুমায়।
পূর্বের সন্তান হারানোর বেদনা
সোনিয়া জানান, তিন বছর আগে তাদের আরেকটি সন্তান হয়েছিল। জন্মের চারদিনের মাথায় মারা যায় সেই সন্তান। এরপর দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর তাসমিদের পৃথিবীতে আসে। এই মা বলেন, ছয় মাস আমার কলিজার ভিতরে আছিলো। বুকের মধ্যে রাখছি। আমার স্বপ্ন ছিল, আমার বাবাটারে হাফেজ বানামু। কিন্তু, পারলাম না বাঁচাইতে।
মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন সোনিয়া
ছেলে হারানোর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন সোনিয়া। তিনি এখন আর নিজের বাসায় কেরানীগঞ্জে থাকতে পারেন না। তার স্বামী নয়ন বলেন, সে কিছু খাইতেছে না, ঠিকমতো ঘুমায় না। ঘুমের ওষুধ দিয়া ঘুম পাড়ানো লাগে। ঘুম ভাঙলেই মানিক মানিক কইরা কান্দে। এ বাসায় থাকলে নাকি তার বেশি কষ্ট হয়, তাই ভাইয়ের বাসায় আছে। সোনিয়া বলেন, আমি এখন কারে নিয়ে থাকমু? আমার বাবা নাই, মা নাই—আমার মানিকটা ছিল। এখন আমি একা হয়ে গেছি। রাত হলেই দুঃস্বপ্ন তাড়া করে সোনিয়াকে। তিনি বলেন, স্বপ্নে দেখি আমার বাবা ডাকতেছে—মা তুমি এখানে আসো, আমি একা থাকি। আমি কষ্ট পাই।
কবরের কথা মনে পড়লেই কান্না
ছেলের কবরের কথা মনে পড়লেই বুক ভেঙে যায় সোনিয়ার। কান্না করতে করতে এই মা বলেন, মানিকের কবর দেখলে মনে হয়, আমি ওখানেই চলে যাই। কথা শেষ হয় সোনিয়ার সঙ্গে, কিন্তু শেষ হয় না তার কান্না। থামে না এই মায়ের আহাজারি।



