নেত্রকোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে আজ বুধবার ৯টা পর্যন্ত মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে জেলায়। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কংস নদের জারিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ৭ দশমিক ১৭ মিটার। আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
এদিকে অব্যাহত বৃষ্টিতে পানি বেড়ে হাওরে কৃষকের চোখের সামনেই খেতের পাকা বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছু ফসল রক্ষা বাঁধের কাছে পানি চলে এসেছে। তবে এখনো বাঁধ ভাঙেনি।
হাওরের বোরো ধানের অবস্থা
স্থানীয় কৃষক, কৃষি বিভাগ, পাউবো ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এক সপ্তাহ ধরে নেত্রকোনায় থেমে থেমে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। এতে কংস, ধনু, উব্দাখালী, সোমেশ্বরী, মগরা, ভুগাইসহ সব নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকে। কিন্তু গতকাল রাত ১০টার পর থেকে আজ বেলা ১১টার দিকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অব্যাহত ভারী বৃষ্টি হয়। এতে কংস নদের জারিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া ধনু নদের খালিয়াজুরি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ৪ দশমিক ১৫ মিটার। সকাল ৯টার দিকে সেখানে প্রবাহিত হচ্ছিল ৩ দশমিক ৮৬ মিটার।
পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান তলিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে আতঙ্কে আছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে পানি বাড়তে থাকলে ২০১৭ সালের মতো অকালবন্যায় ফসল হারাতে হবে। হাওরে মাত্র ৫২ শতাংশ খেতে ধান কাটা হয়েছে। ফসলহানি ঘটলে কৃষকদের সারা বছরের আয়ে বিপর্যয় নেমে আসবে।
ধান কাটায় বাধা
হাওরে এবার ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর খেতে বোরো আবাদ হয়েছে। জেলায় ধানের মোট আবাদ ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। গত কয়েক বছর হার্ভেস্টার যন্ত্র দিয়ে কৃষকেরা খেতের ধান কেটেছেন। পাশাপাশি শ্রমিক দিয়েও ধান কাটা হতো। কিন্তু এবার অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ খেতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটার যন্ত্র সেখানে চালানো যাচ্ছে না। আর শ্রমিকসংকট আছে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত হওয়ায় কৃষকেরা মাঠে ধান কাটতে ভয় পাচ্ছেন। গত এক মাসে বজ্রপাতে হাওরে পাঁচজন প্রাণ হারান। অন্যদিকে অতিবৃষ্টির পানিতে পাকা ধান নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খালিয়াজুরির ছায়ার হাওর, বায়রা হাওর, চুনাই হাওর, বাইদ্যার চর, কাটকাইলেরকান্দা, নন্দের পেটনা, কীর্তনখলা, রয়াইল, মোহনগঞ্জের ডিঙাপোতা, মদনের গোবিন্দশ্রী, উচিতপুর, কদমশ্রী, কলমাকান্দার সোনাডুবি, গোরাডোবা, আঙ্গাজুরা, মহিষাশুরা, মেদী, তেলেঙ্গাসহ বেশ কিছু হাওরের পানিতে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর খেতের বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া অধিকাংশ খেতে হাঁটুর ওপরে পানি জমেছে।
কৃষকদের বক্তব্য
আজ সকালে মদনের কুলিহাটি গ্রামের কৃষক আসাদুল্লাহ রিয়াদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, উচিতপুর হাওরে পানিতে তাঁর পাঁচ এক জমির ধান তলিয়ে গেছে। যে খেতের ধান এখনো ভেসে আছে, তা–ও কাটতে পারছেন না শ্রমিকের অভাবে। তিনি বলেন, ‘গতকাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হইতাছে। ১৪০০ টেহা রোগ দিয়া কামলা ঠিক করছিলাম। কিন্তু বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকেরা খেতে যাইতাছে না। চোক্ষের সামনে আমার মতো সব কৃষকরার ধান ডুইব্বা যাইতাছে, কিচ্ছু করার নাই।’
খালিয়াজুরির জগন্নাথপুরের রোমন মিয়া বলেন, ‘ধুন নদের পানি বাড়তাছে। বিভিন্ন হাওর ও বেড়ি বাঁধের কাছে পানি। সব ধান ডুইব্বা যাইতাছে। হাওরে অহনো অর্ধেক খেতের ধান কাটনের বাকি। ধান কাটনের লোক পাওয়া যাইতাছে না।’
প্রশাসনের প্রস্তুতি
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন আজ বুধবার বলেন, ‘অনেক হাওরে বৃষ্টির পানি জমেছে। তবে এখনো সব কটি বেড়িবাঁধ ঠিক আছে। জেলা ছাড়াও ভারতের চেরাপুঞ্জি, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। এতে পানি আরও বেড়ে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই বাঁধ হুমকির মুখে পড়বে। উপজেলা প্রশাসনকে নিয়ে আমরা এলাকায় অবস্থান করছি। ফসল রক্ষা বাঁধ রক্ষায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে।’
খালিয়াজুরির কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন বলেন, পানিতে বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৫০০ হেক্টর খেতের ধান ডুবে গেছে। এখনো উপজেলায় অর্ধেক খেতের ধান কাটা বাকি।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘কৃষকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কাটতে পারেন, সে জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি আমরা বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলেছি। আমাদের ইউএনওরা মাঠে আছেন। তাঁদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে জিও ব্যাগ ফেলার দরকার, সেখানে তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’



