ঠাকুরগাঁওয়ে আবুল কালাম আজাদের আঙুর বিপ্লব: মরুর স্বপ্ন বাংলার মাটিতে
ঠাকুরগাঁওয়ে আজাদের আঙুর বিপ্লব: মরুর স্বপ্ন বাংলায়

ঠাকুরগাঁওয়ে আবুল কালাম আজাদের আঙুর বিপ্লব: মরুর স্বপ্ন বাংলার মাটিতে

তপ্ত বালুর দেশ সৌদি আরবের মরুপ্রান্তরে যখন রোদে পুড়ে ঘাম ঝরাতেন, তখন পীরগঞ্জের এক যুবকের চোখের সামনে ভেসে উঠত সবুজ আঙুর বাগানের সারি। নব্বইয়ের দশকের সেই স্বপ্ন আজ তিন দশক পর ধরা দিয়েছে উত্তরের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ে। পীরগঞ্জের বসন্তপুর গ্রামে এখন মরুভূমির সেই লতা শোভা পাচ্ছে বাংলার পলিমাটিতে, আর তাতে থোকায় থোকায় ঝুলছে কৃষকের রঙিন স্বপ্ন।

প্রবাসী জীবনের স্বপ্ন থেকে কৃষি বিপ্লব

১৯৯৩ সালে ভাগ্যের অন্বেষণে সৌদি আরব পাড়ি দিয়েছিলেন আবুল কালাম আজাদ। সাড়ে তিন বছর প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনির মাঝেও তার মন পড়ে থাকত আরবের আঙুর বাগানগুলোতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রবাসে দেওয়া শ্রমের অর্ধেক যদি দেশের মাটিতে ঢালা যায়, তবে সোনা ফলানো সম্ভব। সেই জেদ থেকেই দেশে ফিরে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মাত্র ৫ বিঘা জমি নিয়ে শুরু হয় তার লড়াই। কঠোর পরিশ্রমে আজ সেই জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৫ বিঘায়।

আঙুর চাষের অনন্য মডেল

কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়িয়ে কিভাবে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়, তার এক অনন্য মডেল তৈরি করেছেন আজাদ। তিনি তার দুই একরের বিশাল পুকুর এবং বসতবাড়ির অব্যবহৃত জায়গাকে কাজে লাগিয়ে লোহার তার, সিমেন্টের খুঁটি আর বাঁশের মাচায় গড়ে তুলেছেন বিশাল এক ছাউনি। প্রায় ৮ লাখ টাকা বিনিয়োগে তৈরি এই বাগানে শোভা পাচ্ছে বাইকোনুর, সিলভা, অ্যাপোলো ও ডিক্সনসহ ২২টি ভিন্ন জাতের প্রায় ১২শ আঙুর গাছ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আজাদের প্রত্যাশা, প্রতি গাছে ৫ থেকে ১০ কেজি ফলন পাওয়া যাবে। জুনের শেষে যখন এই ফল পাকতে শুরু করবে, তখন এক মৌসুমেই প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। বাজারের আমদানিকৃত বিদেশি আঙুরের চেয়েও এই আঙুর অনেক বেশি মিষ্টি ও সুস্বাদু বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বহুমুখী ফসলের স্বয়ংসম্পূর্ণ খামার

আজাদ কেবল আঙুর চাষি নন, তিনি ফসলের বহুমুখীকরণের এক রূপকার। তার খামারে পা রাখলে মনে হয় এটি কোনো কৃষি গবেষণাগার। আঙুরের ছায়াতলে একপাশে রয়েছে ৫ হাজার সুপারি গাছ, অন্যপাশে ড্রাগন, আনারস, লটকন, নাশপাতি এবং মসলা জাতীয় ফসল চুইঝাল ও গোলমরিচ। প্রথাগত ধান-গম-ভুট্টার পাশাপাশি পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গবাদি পশু নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক কৃষি স্বর্গ।

এ বিষয়ে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ফসলের বহুমুখীকরণই গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের একমাত্র পথ। শুধু প্রথাগত চাষে আটকে না থেকে আমাদের জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

কৃষি পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর

আজাদের এই সাফল্য এখন ঠাকুরগাঁওয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী ভিড় করছেন এই ‘আঙুর বিপ্লব’ দেখতে। বসন্তপুর গ্রামটি এখন আর সাধারণ কোনো গ্রাম নেই, এটি হয়ে উঠেছে এক কৃষি পর্যটন কেন্দ্র। ঠাকুরগাঁও শহরের সাহাপাড়া মহল্লার ফিরোজ আমিন সরকার বলেন, সবুজে ঘেরা এই খামারে এলে যেন স্বর্গের সুখ মেলে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, আজাদের এই উদ্ভাবনী শক্তিতে আমি অভিভূত। দোআঁশ মাটিতে সঠিক প্রযুক্তি ও পোকা দমন নিশ্চিত করতে পারলে উত্তর জনপদে আঙুর চাষ বাণিজ্যিকভাবে বিপ্লব ঘটাতে পারে।

আশার আলো দেখাচ্ছে ক্ষুদ্র কৃষকদের

আবুল কালাম আজাদ প্রমাণ করেছেন, কৃষি মানে কেবল কাদা-জলে হাড়ভাঙা খাটুনি নয়; এটি একটি সৃজনশীল শিল্প ও লাভজনক ব্যবসা। তার এই যাত্রা ক্ষুদ্র কৃষকদের মনে আশার আলো দেখাচ্ছে। নিষ্ঠা আর স্বপ্ন থাকলে যে বাংলার মাটিতেও মরুর আঙুর মিষ্টি হয়ে ঝরতে পারে, আজাদ আজ তার জীবন্ত কিংবদন্তি।