দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় সয়াবিন ও পাম তেল দিয়ে। তবে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি প্রক্রিয়াকরণ সহজ হওয়ায় সূর্যমুখী তেলের চাহিদা ও উৎপাদন—দুটোই বাড়ছে। গত তিন বছরে উৎপাদন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। শর্ষের মতো সূর্যমুখী ভাঙানোর নতুন মেশিন বাজারে আসায় তেল উৎপাদন সহজ হয়েছে, ফলে কৃষকেরা এই ফসল চাষে ঝুঁকছেন।
উৎপাদন ও বাজারের পরিসংখ্যান
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে সূর্যমুখী উৎপাদিত হয় ১৫ হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বেড়ে ২৭ হাজার টন ছাড়িয়ে যায়। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অতিবৃষ্টির কারণে উৎপাদন কমে ২২ হাজার টনে নেমে আসে। প্রতি হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর ফলন হয় এক থেকে দেড় টন।
বাজার ও দাম
ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার সূর্যমুখী তেল বিক্রি হয়, যা বছরে ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। বাজারে দেশি–বিদেশি কয়েকটি ব্র্যান্ডের তেল পাওয়া যায়। পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ইউক্রেনের জাদে ব্র্যান্ডের পাঁচ লিটারের টিনের বোতল ১ হাজার ৯০০ টাকা, তুর্কি কিংস তেল ১ হাজার ৮৫০ টাকা, দেশি ইসি অর্গানিকের তেল ১ হাজার ৮০০ টাকা, আমদানি করা গোল্ডেন ড্রপ ২ হাজার ১০০ টাকা, রাঁধুনীর তেল ২ হাজার ৩৫০ টাকা এবং এসিআইয়ের লে ব্ল্যাঙ্ক তেল ১ হাজার ৮৭৫ টাকায় বিক্রি হয়। সুপারশপে দাম আরও বেশি; যেমন মোহাম্মদপুরের একটি সুপারশপে ইসি অর্গানিক ২ হাজার ২৫০ টাকা এবং ব্ল্যাঙ্কসি ২ হাজার ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তেল ব্যবসায় কারা?
২০২৩ সালের শেষ দিকে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইসি অর্গানিক প্রোডাক্টস লিমিটেড সূর্যমুখী তেল বাজারে আনে। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার আশুলিয়ায় কারখানা স্থাপন করেছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভির চৌধুরী জানান, স্থানীয় উৎপাদন কম হওয়ায় দেশি বীজের পাশাপাশি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাঁরা মাসে প্রায় ১০০ টন তেল বিক্রি করছেন এবং পাইলট ভিত্তিতে শোধনাগার স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার কৃষক জেসমিন বেগম সরকারি প্রকল্পের আওতায় পাওয়া মেশিনে দেশি বীজ ভেঙে তেল উৎপাদন করেন। ৪০ কেজি বীজ থেকে ১৬ কেজি তেল পান, যা প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন।
এসিআই এডিবল অয়েলস মাসে প্রায় ৪০ টন সূর্যমুখী তেল বিক্রি করে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব শোধনাগার না থাকায় ইউক্রেন থেকে তেল আমদানি করে বাজারজাত করা হয়। এসিআই ফুডের ব্যবসায় ব্যবস্থাপক জহিরুল ইসলাম জানান, চাহিদা বাড়লে ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের চিন্তা করবে প্রতিষ্ঠানটি।
উৎপাদন বাড়ছে যেভাবে
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় ও ছোট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী তেল উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পও ভূমিকা রাখছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ২৫০টি উপজেলায় তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা থাকায় চাষ কম ছিল। এখন করপোরেট প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছে, কৃষকেরা বেশি বীজ চাইছেন এবং নতুন উদ্যোক্তারা আগ্রহী হচ্ছেন। প্রকল্পের আওতায় উপকূলীয় এলাকায় ৬৫০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে চাষিদের বীজ ও সারসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তেল ভাঙানোর জন্য ৩০০টি মেশিন দেওয়া হয়েছে; চলতি বছর আরও ৩২০টি দেওয়া হবে। প্রতিটি মেশিনের দাম আড়াই লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা।
উপকূলে উৎপাদন বেশি
সূর্যমুখীগাছ লবণাক্ততা সহনশীল হওয়ায় উপকূলীয় এলাকার পতিত জমিতে এর চাষ বাড়ছে। নোয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, সাতক্ষীরা ও পিরোজপুর এলাকায় চাষ বেশি হচ্ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরগুনায় সর্বোচ্চ ৯১৫ টন ও পিরোজপুরে ৭১৩ টন বীজ উৎপাদন হয়। এ ছাড়া বাগেরহাটে ৩৪৫ টন, নোয়াখালীতে ২৪৮ টন ও ঝালকাঠিতে ২৩১ টন উৎপাদন হয়েছে।
চাষে লাভ
প্রতি কেজি বীজের দাম প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতি বিঘায় ৪০০ গ্রাম বীজ লাগে, যার দাম ১ হাজার ৪০০ টাকা। নিজেদের শ্রম বাদে সার ও সেচ মিলিয়ে প্রতি বিঘায় আরও ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হয়, অর্থাৎ মোট খরচ সাড়ে ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩২ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর ৫০ শতাংশ পাম তেল, ২৮ শতাংশ সয়াবিন তেল, ১৯ শতাংশ শর্ষে তেল এবং বাকি ৩ শতাংশ সূর্যমুখীসহ অন্য তেলে পূরণ হয়।



