গাজীপুরে তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। প্রচণ্ড গরমে কিছুটা স্বস্তির খোঁজে গাজীপুরের বিভিন্ন বিনোদন পার্কের সুইমিং পুলে ভিড় করছেন শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী ও বয়স্কসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। অন্যদিকে, এই ভিড়ের সুযোগে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন পার্কমালিকরা। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ভিড়ে সুইমিং পুলে গোসলের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
সুইমিং পুলে উপচেপড়া ভিড়
গত কয়েকদিন ধরে গাজীপুরে তীব্র রোদ ও ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা বিরাজ করছে। এই গরমে কিছুটা আরামের আশায় বিনোদন পার্কগুলোর সুইমিং পুলে ছুটছেন মানুষ। কালিয়াকৈর এলাকার নন্দন পার্ক, সোহাগপল্লী, রাঙ্গামাটি ওয়াটারফ্রন্ট, গোলবাগিচা ও শাহিনবাগসহ জেলার বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে সৃষ্টি হয়েছে মানুষের ঢল। এসব কেন্দ্রের কৃত্রিম সুইমিং পুলে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত গোসলের ব্যবস্থা রয়েছে। তীব্র গরমের কারণে অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে সকাল সকাল বাসা থেকে বেরিয়ে সরাসরি সুইমিং পুলে চলে যাচ্ছেন। কেউ পোশাকসহ, কেউ আবার গামছা বা লুঙ্গি পরে পানিতে নেমে পড়ছেন। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনের আনন্দে গোসল করছেন। দুপুরের পর ভিড় আরও বাড়ে। অনেক পুলে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ একসঙ্গে গোসল করছেন। হঠাৎ দর্শনার্থীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় বিনোদন কেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনা হিমশিম খাচ্ছে।
অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ
দর্শনার্থীদের অভিযোগ, সুইমিং পুলে মানুষের উপচেপড়া ভিড়ের সুযোগে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছেন পার্কমালিকরা। অধিকাংশ সুইমিং পুলে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ গোসল করছেন, যা পানির গুণগতমান নষ্ট করার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অভিভাবকরা বলছেন, সুইমিং পুলে লাইফগার্ডের সংখ্যা খুবই কম। ১৫০-২০০ জনের জন্য মাত্র ১ বা ২ জন লাইফগার্ড দায়িত্বে থাকছেন। শিশু-কিশোরীরা সাঁতার না জানলেও গভীর পানিতে নেমে যাচ্ছে, যা যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চিকিৎসকের পরামর্শ
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ভিড়ে সুইমিং পুলে গোসল করলে চর্মরোগ, ফাঙ্গাস ইনফেকশন ও চোখের কনজাংটিভাইটিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়াও অনেকে পানিতে প্রস্রাব ও থুথু ফেলেন, যা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়ায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাদিয়া তাসনিম বলেন, ভ্যাপসা গরমে হিটস্ট্রোক এড়াতে প্রতি ২০ মিনিট পরপর ছায়ায় বসে বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইন খেতে হবে। শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি: গোসলের আগে ও পরে সাবান ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করা। সুইমিং পুলের পানি ক্লোরিনযুক্ত না হলে সেখানে না নামাই ভালো।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিক্রিয়া
বরাব এলাকার বাসিন্দা রনি আহম্মেদ বলেন, তীব্র তাপদাহে ঘরে থাকা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈদ্যুতিক পাখা চললেও গরম লাগে, তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে সুইমিং পুলে আসছি। পানিতে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা থাকার পর একটু স্বস্তি লাগছে। বড়ইবাড়ী এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ভ্যাপসা গরমে বাচ্চারা কান্নাকাটি করছিল, তাই ১৫০ টাকা করে টিকিট কেটে সুইমিং পুলে নিয়ে এসেছেন। গোসলের পর বাচ্চারাসহ তারাও স্বস্তি পেয়েছেন। রায়হান হোসেন জানান, অতিরিক্ত গরমে সুইমিং পুলে উপচেপড়া ভিড় সৃষ্টি হচ্ছে, আর পার্কমালিকরা সুযোগে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।
পার্ক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রিসোর্টের কর্মী জানান, হঠাৎ গরমের কারণে সুইমিং পুলে অতিরিক্ত মানুষ আসছে। তারা নিয়মিত পানি পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করছেন, কিন্তু লাইফগার্ড ও কর্মী সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ নেই। মাইকিং করে সতর্ক করলেও কেউ শোনে না। তবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে কথা বলতে নারাজ এসব বিনোদন কেন্দ্রের সংশ্লিষ্টরা।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এএইচএম ফখরুল হোসাইন জানান, হঠাৎ ভ্যাপসা গরমে সুইমিং পুলে দর্শনার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।



