শিক্ষার্থীদের হাতে ধান কাটা: শ্রমিক সংকটে কৃষকের পাশে দাঁড়ানো
ঝিনাইদহের কাপাসহাটিয়া মাঠে এখন শিক্ষার্থীদের কৃষক বনে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ছে। টিটন হাসান, নাজমুল হোসেন ও আলমগীর হোসেন—এরা কেউই কৃষক নন; বরং বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। পড়ালেখার পাশাপাশি ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিকসংকটে তারা মাঠে নেমে পড়েছেন। জমির ধান কেটে একদিকে শ্রমিকসংকটে কৃষকের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, অন্যদিকে অবসর সময়ে বাড়তি কিছু আয় করছেন।
ধান কাটায় শিক্ষার্থীদের ভূমিকা
ঝিনাইদহের ছয়টি উপজেলায় প্রায় ৫০ শতাংশ পাকা ধান এখনো মাঠে। কৃষকেরা কেটে উঠতে পারেননি। বৃষ্টি ও শ্রমিকসংকটে মাঠে পাকা ধান ফেলে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। এমন সময় জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় কৃষক পরিবারের স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা কৃষকদের ধান কেটে শ্রমিকসংকট নিরসনে সহায়তা করছে। এতে শিক্ষার্থী ও কৃষক উভয়ই উপকৃত হচ্ছেন।
কৃষকদের অভিজ্ঞতা
স্থানীয় ঘোড়দহ গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, কাপাহাটিয়া বাঁওড়ের পাশে তাঁর দেড় বিঘা ধানের জমি আছে। ধান কাটার উপযুক্ত হয়েছে চার থেকে পাঁচ দিন আগেই। কিন্তু শ্রমিক না পাওয়ায় কাটতে পারেননি। যেকোনো মুহূর্তে আবার বৃষ্টি শুরু হলে বিপদ হয়ে যেত। আশপাশের গ্রামে খোঁজ করেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে গ্রামের স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছেলেরা এগিয়ে আসে। তাদের সঙ্গে কথা বলে খড়ের আঁটি বাঁধা ও কাটা ধান স্তূপ করে রাখার জন্য পাঁচ হাজার টাকার চুক্তি করেন। তাদের মধ্যে চারজন এক বিকেলের মধ্যেই কাজটি শেষ করে ফেলে।
একই গ্রামের আরেক কৃষক খয়বর আলী বলেন, সব জমিতে একসঙ্গে ধান পেকে যাওয়ায় শ্রমিক পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিকেরা উচ্চ মজুরি দাবি করছেন। প্রত্যেক শ্রমিককে দৈনিক তিন বেলা খাবারের সঙ্গে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এরপরও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। সংকটকালে এলাকার স্কুল–কলেজগামী ছেলেরা চুক্তিতে ধান কাটা শুরু করেছে। এতে তাঁদের অনেক উপকার হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি
এলাকার রহিম মণ্ডলের জমিতে খড়ের আঁটি বাঁধতে বাঁধতে ভালকি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র টিটন হাসান জানায়, সে কৃষক পরিবারের সন্তান। সাধারণত বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। ফসল কাটার মৌসুমে শ্রমিকের অভাব দেখে তারা কয়েকজন মাঠে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর কয়েকজন কৃষকের কাজ করে দিয়েছে তারা।
একই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র নাজমুল হক জানায়, কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তারা এ ধরনের কাজে অভ্যস্ত। এ জন্য কাজ করতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে আনন্দের সঙ্গে কাজগুলো করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঝিনাইদহ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছর জেলায় ৯০ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতিজনিত কিছু অসুবিধা সত্ত্বেও এ মৌসুমে ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ঝিনাইদহের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, কৃষকেরা প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকেই ধান কাটা শুরু করেছেন। তবে প্রায় ৫০ শতাংশ পাকা ধান এখনো মাঠে। কিছুদিন আগে বৃষ্টির কারণে কৃষকেরা ফসল কাটা বিলম্বিত করেন এবং ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। এখন জেলাজুড়ে একসঙ্গে ধান পেকে যাওয়ায় শ্রমিকের তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। অনেকে বেশি মজুরি দাবি করছেন।



