মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা সরকারের
মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা

দেশে প্রথমবারের মতো মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এর আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, এই প্রস্তাবটি আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

প্রস্তাবিত কর কাঠামো

প্রস্তাব অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা বা সিসি অনুযায়ী বছরে ২,০০০ টাকা থেকে ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর দিতে হতে পারে। একইসঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপরও সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বার্ষিক কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, সোমবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এক বাজেট বৈঠকে এনবিআর মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় নতুন অগ্রিম আকর আরোপের প্রস্তাব দেয়। একইসঙ্গে উচ্চ সিসির বিলাসবহুল গাড়ির বিদ্যমান অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিলাসবহুল পণ্য ও উচ্চমূল্যের যানবাহন থেকে আরও রাজস্ব সংগ্রহের কৌশল হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত কম সিসির মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।”

স্তরভিত্তিক কর কাঠামো

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের জন্য ইঞ্জিন ক্ষমতার ভিত্তিতে একটি স্তরভিত্তিক কর কাঠামো চালু করা হচ্ছে। এই নতুন পরিকল্পনায় ১১০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিনের বাইক করমুক্ত থাকবে। তবে ১১১ সিসি থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের মালিকদের বছরে ২,০০০ টাকা কর দিতে হবে, ১২৬ সিসি থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত বাইকের জন্য বছরে ৫,০০০ টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি ইঞ্জিনের মোটরসাইকেলের জন্য প্রস্তাবিত বার্ষিক কর ১০,০০০ টাকা।

বর্তমানে মোটরসাইকেল মালিকদের নিবন্ধন ফি ও সড়ক কর দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে এর সঙ্গে অগ্রিম আয়করও দিতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৯ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৩৮ লাখ বাইক করযোগ্য সীমার মধ্যে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিটি বাইক থেকে গড়ে ৪,০০০ টাকা কর আদায় সম্ভব হলে সরকারের কোষাগারে বাড়তি রাজস্ব আসতে পারে বছরে প্রায় ১,৫২০ কোটি টাকা।

কেন এই কর?

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ক্রমাগত কমছে। বর্তমানে তা ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় মোটরসাইকেলকে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে দেখা হলেও এখন তা দেশের কোটি মানুষের জীবিকার প্রধান বাহন। রাইড-শেয়ারিং, কুরিয়ার ও ডেলিভারি সার্ভিস, ফার্মাসিউটিক্যাল সাপ্লাই, সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবাই এখন মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল।

ঢাকায় এক রাইড-হেইলিং চালক বলেন, “আমি ১২৫ সিসির বাইক চালিয়ে সংসার চালাই। তেল, খুচরা যন্ত্রাংশ, সার্ভিসিং—সব খরচ বেড়েছে। এখন যদি প্রতি বছর কর দিতে হয়, তাহলে বেঁচে থাকা কঠিন হবে।”

গত এক দশকে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। হোন্ডা, ইয়ামাহা, সুজুকি, বাজাজ, টিভিএস-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল এখন দেশে যুক্ত হচ্ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কর আরোপের ফলে মোটরসাইকেল বিক্রি কমতে পারে। এতে শিল্পে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একজন শিল্প উদ্যোক্তা বলেন, “যারা ৬-৭ লাখ টাকার বাইক কেনেন, তাদের জন্য কর বড় বিষয় নয়। কিন্তু মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য বছরে অতিরিক্ত ৫,০০০ টাকা একটি বড় বোঝা হবে।”

উচ্চ সিসির গাড়িতেও কর বাড়ানোর পরিকল্পনা

শুধু মোটরসাইকেল নয়, উচ্চ সিসির গাড়ির ওপরও কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এসইউভি নিবন্ধিত রয়েছে। এগুলোর একটি বড় অংশের ইঞ্জিন ক্ষমতা ২,৫০০ সিসি থেকে ৪,০০০ সিসির বেশি। এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) তদন্তে দেখা গেছে, দেশে ৩,০০০ সিসির বেশি ইঞ্জিনের অন্তত ৫,২৮৮টি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে।

‘বাংলা টেসলা’ও করের আওতায়

সরকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা—যাকে অনেকে ‘বাংলা টেসলা’ বলছেন—কেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশে বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে। এগুলোর একটি বড় অংশ অরেজিস্টার্ড।

গত বছর সরকার ‘ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলার ম্যানেজমেন্ট পলিসি ২০২৫’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করে। সেখানে নিবন্ধন, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ট্যাক্স টোকেন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “যারা মোটরসাইকেল কেনার সামর্থ্য রাখে, তাদের কিছু কর দেওয়ার ক্ষমতাও থাকা উচিত। কিন্তু ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে এগুলোর অধিকাংশই অরেজিস্টার্ড। সেখানে কর আদায় বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না।”

আয়কর আইন অনুযায়ী, এই অগ্রিম আয়কর পরে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় সমন্বয় করা যাবে। অর্থাৎ করদাতারা বছরে যে অগ্রিম কর দেবেন, তা চূড়ান্ত কর গণনার সময় সমন্বয় করার সুযোগ পাবেন।