জ্বালানি তেল সংকটে সাধারণ মানুষের পকেটে আঘাত: বাইকার থেকে বাজারে বাড়তি দামের খেলা
রাজধানীর ঝিগাতলা থেকে গুলশানে যাওয়ার জন্য রাইড শেয়ারিংয়ের মোটর বাইকে অর্ডার করি। স্ক্রিনে ভাড়া দেখায় ১৫৯ টাকা। একজন আগ্রহী চালক ফোন করে বললেন, ‘২০০ টাকা দিয়েন।’ বললাম, ৪০ টাকা বেশি দেবো কেন? তার সহজ উত্তর, ‘বেশি দাম দিয়ে তেল কিনেছি।’ ওই বাইকারকে ক্যানসেল করে আবারও অর্ডার দেওয়ার পরে যিনি ফোনটা রিসিভ করলেন তারও একই কথা। ২০০ টাকা দিতে হবে। অফিসে জরুরি কাজ থাকায় রাজি হয়ে যাই।
বাড়তি খরচের বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধে
ধরা যাক, বাইকারদের বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। কিন্তু সেই বাড়তি খরচটা তারা আদায় করছেন যাত্রীদের কাছ থেকে। এখানে বাইকারের কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। পেট্রোল পাম্প মালিকের ব্যবসায়ও টান পড়ছে না। যারা তেল উৎপাদন করেন, তাদেরও কোনও অসুবিধা হচ্ছে বলে মনে হয় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত পয়সাটা যাচ্ছে সাধারণ ভোক্তার পকেট থেকে।
এই যখন পরিস্থিতি তখন হঠাৎ করে বাজার থেকে সয়াবিন তেলও উধাও। মঙ্গলবার (১৪ এপিল) একাধিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে, রাজধানীর কাওরান বাজারসহ অনেক বড় বাজার এবং পাড়া-মহল্লার দোকানেও সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, সয়াবিন তেল কি হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে? কী কারণে হঠাৎ করে বাজার থেকে ভোজ্যতেল গায়েব হয়ে গেলো? দেখা যাবে, কয়েক দিনের মধ্যেই এই সংকট নিয়ে ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হবে। বৈঠক শেষে জানানো হবে, প্রতি লিটারে তেলের দাম বেড়েছে ১০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি লিটারে ১০ টাকা দাম বাড়ানোর মধ্য দিয়ে তেলের উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে ডিলার, কাওরান বাজারের বড় বিক্রেতা এবং তারপর পাড়া-মহল্লার খুচরা বিক্রেতা—প্রত্যেকেই অতিরিক্ত মুনাফা করবেন। কিন্তু বাড়তি পয়সাটা গুনবেন সাধারণ ক্রেতা। অর্থাৎ পণ্যের সংকটে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয় না। বরং তারা যেকোনও সংকটকে পুঁজি করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত হাতিয়ে নেন। মাঝখান দিয়ে ভিকটিম হয় সাধারণ মানুষ। জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও সম্ভবত একই ঘটনা ঘটছে।
জ্বালানি তেল সংকটের পেছনে সম্ভাব্য কারণ
জ্বালানি তেল পেতে গিয়ে পাম্পগুলোর সামনে এবং আশপাশের রাস্তায় যানবাহনের লাইন যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, তখনই খবর এলো, ক্রুড বা অপরিশোধিত তেল সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন কার্যক্রম। গণমাধ্যমের খবর বলছে, রবিবার (১২ এপিল) বিকালে শেষবারের মতো উৎপাদন চালানোর পর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
এর আগের দিন গণমাধ্যমের আরেকটি খবরের শিরোনাম: ‘‘বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন’’। খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি খাত অস্থির। এর প্রভাবে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে খরচ বেড়েছে। এখন বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করতে চায় সরকার। এ জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, দাম সমন্বয়ের অর্থই হলো দাম বাড়ানো।
তার মানে জ্বালানি তেলের চলমান সংকটের ভেতরে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন বন্ধ এবং বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ এখন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, দেশে জ্বালানি তেলের সংকট নেই বা শিগগিরই সংকট তৈরির শঙ্কা নেই—সরকারের তরফে বারবার এমন আশ্বাস দেওয়ার পরেও পাম্পের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি কেন ছোট হচ্ছে না, বা সরকারের কথার সঙ্গে বাস্তবতার কোনও মিল নেই কেন? এখানে সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। যেমন:
- সরকারের দায়িত্বশীলরা মাঠের চিত্র না জেনেই বক্তব্য দিচ্ছেন বা তারা জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাইছেন, যাতে তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার দিকে না ঝোঁকে।
- শুরু থেকেই মানুষের প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কজনিত ক্রয়ের যে প্রবণতার কথা বলা হচ্ছিল, অর্থাৎ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে যেভাবে মজুত করছিল, সেই প্রবণতা আরও বেড়েছে।
- চলমান সংকটকে পুঁজি করে অনেকেই বিভিন্ন পাম্পে গিয়ে নিজেদের যানবাহনের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে যারা পাম্পে যেতে আগ্রহী নন, বা যেতে পারছেন না, তাদের কাছে দেড় থেকে দুই গুণ দামে তেল বিক্রি করছেন। অর্থাৎ সংকটকে পুঁজি করে একটি গোষ্ঠী নতুন ব্যবসার লাইন খুলেছে। শোনা যায়, রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত মোটরসাইকেল চালকরা এই কাজ বেশি করছেন। তারা বিভিন্ন পাম্পে ঘুরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে অনেক বেশি দামে বিক্রি করছেন। অর্থাৎ একদিকে সংকট অন্য দিকে কারও কারও জন্য এটি নতুন ব্যবসার সুযোগ!
- নিজের প্রয়োজনের বাইরেও অতিরিক্ত তেল কিনে দেশের বাইরে কেউ তেল পাচার করছে।
- দেশে পেট্রোল ও অকটেনের উৎপাদন কমে গেছে।
- উৎপাদন ঠিক আছে, কিন্তু সরবরাহ লাইনে হতে পারে। অর্থাৎ পাম্পগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ জ্বালানি তেল দরকার, পাম্পগুলো সেই পরিমাণ তেল পাচ্ছে না।
- তেলের উৎপাদন থেকে শুরু করে পাম্পে বিক্রি পর্যন্ত প্রক্রিয়ার ভেতরে থাকা লোকজন সংকটকে পুঁজি করে হয়তো এমন কোনও সিস্টেম করে রেখেছেন, যাতে করে এই সুযোগ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া যায়।
- একটি গোষ্ঠী নতুন সরকারকে বিপদে ফেলা তথা অজনপ্রিয় করতে তেলের এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। সরকারের ভেতরের কোনও ‘গুপ্ত’ গোষ্ঠী এর সঙ্গে যুক্ত আছে।
এর বাইরে আরও কোনও থাকতে পারে। তবে চলমান তেল সংকটের পেছনে সম্ভবত প্রধান কারণ হলো সরকারের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
সরকারের জবাবদিহিতা ও পদক্ষেপের প্রশ্ন
প্রশ্ন হলো, সরকারের কাছে কি এই প্রশ্নের সঠিক জবাব আছে যে, জ্বালানি তেল নিয়ে তাদের বক্তব্যের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার কোনও মিল নেই কেন? সেইসঙ্গে তেল কিনে অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং পাচারের যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে সরকারের বক্তব্য কী? উপরোল্লিখিত ধারণাগুলো যদি সঠিক হয়, তাহলে সেগুলো মোকাবিলায় সরকার এ পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতেও সংকটের সমাধান হচ্ছে না কেন? যদি একটি গোষ্ঠী সত্যিই প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত ক্রয় করে সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে তাদেরকে সরকার কীভাবে শনাক্ত করবে, সেই মেকানিজম কি সরকারের আছে?
সংকটকে পুঁজি করে যদি একটি গোষ্ঠী নতুন ব্যবসার ফাঁদ পেতে বসে, সরকারের গোয়েন্দা বাহিনী কি তাদের ধরতে পারছে বা কতজনকে ধরবে? একটি গোষ্ঠী সংকট তৈরি করে বা সংকটকে পুঁজি করে গত এক দেড় মাসে পাবলিকের পকেট থেকে কত কোটি টাকা হাতিয়ে নিলো, তার কোনও হিসাব আছে? সরকারের পক্ষে কি দেশের প্রতিটি পাম্পে নজরদারি এবং প্রতিটি যানবাহনকে অনুসরণ করে এটা বের করা সম্ভব যে কারা পাম্প থেকে তেল কিনে নিয়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে? মানুষ যদি নিজেরা সৎ না হয়, তারা যদি সংকটকে নতুন ব্যবসার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলে, সেখানে সরকারের একার পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয় এটা যেমন সত্য, তেমনই এই কথা বলে সরকার নিজের দায়ও এড়াতে পারে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকেই আরও তৎপর হতে হবে। সেইসঙ্গে মানুষের নীতি-নৈতিকতা আর সততার মান উন্নত না হলে শুধু ভয় দেখিয়ে বা দেশপ্রেমের কথা বলেও লাভ নেই।
অবশ্য যে দেশের মানুষ করোনার মতো অতিমারি থেকেও কোনও শিক্ষা নেয়নি, সেই দেশে নীতি-নৈতিকতা, সততা আর দেশপ্রেমের মহৎ বাণী অনেক সময় রম্য গল্পের মতো মনে হয়।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক



