মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দেড় মাস চাপের মধ্যে ছিল দেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী তেলবাহী জাহাজ না আসা, হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্চজুড়ে ভোগান্তি ছিল। তবে এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। সরবরাহ বাড়ায় এখন জ্বালানি তেলের বড় ধরনের সংকট নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
মার্চে সংকট, এপ্রিলে স্বস্তি
বিপিসি সূত্র বলছে, মার্চে সমুদ্রপথে ১০টি জাহাজ ও ভারত থেকে পাইপলাইনে চারটি পার্সেলে মোট ৩ লাখ ২২৩ টন জ্বালানি তেল দেশে আসে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সূচির বেশ কয়েকটি চালান পিছিয়ে যাওয়ায় ওই মাসে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এপ্রিল মাসে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। ওই মাসে ১৮টি জাহাজে প্রায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার টন তেল এসেছে। এর বাইরে ভারত থেকে পাইপলাইনে এসেছে আরও ২৫ হাজার টন ডিজেল। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আমদানির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
মে মাসেও ধারাবাহিকতা বজায়
এই ধারাবাহিকতা মে মাসেও ধরে রাখতে চাইছে সরকার। বিপিসির হিসাবে, চলতি মাসে ১৯টি জাহাজে প্রায় ৫ লাখ টন জ্বালানি তেল আসার কথা রয়েছে। এর মধ্যে মাসের প্রথম ১০ দিনেই এসেছে ৯টি জাহাজ। সর্বশেষ ‘এমটি টর্ম দুর্গা’ নামের জাহাজে তেল পাঠিয়েছে ওমানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওকিউটি। জাহাজে ২৭ হাজার টন ডিজেল ছিল। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বাকি চালানগুলো এলেও সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে।
মজুত পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক
বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার টন, যা দিয়ে ২১ দিন চলা সম্ভব। অকটেনের মজুত ৪৮ হাজার ১৪৩ টন, যা দিয়ে ৪০ দিন চাহিদা মেটানো যাবে। পেট্রলের মজুত আছে ১৯ হাজার ৫৯০ টন, যা ১৪ দিনের জন্য যথেষ্ট। ফার্নেস অয়েলের মজুত ৪১ হাজার ২৮১ টন, জেট ফুয়েলের মজুত ৪৬ হাজার ৮৩১ টন।
সরবরাহ বাড়ায় মাঠপর্যায়ে পরিবর্তন
আমদানি বাড়ার কারণে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিরও পরিবর্তন এসেছে। গত ১৯ এপ্রিল সরকার অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ এবং ডিজেল ও পেট্রলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়। এরপর থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভিড় কমতে শুরু করে। আগে যেখানে একাধিক পাম্পে তেল ফুরিয়ে যাচ্ছিল, এখন সেখানে নিয়মিত সরবরাহ ফিরতে শুরু করেছে। যদিও সরবরাহ বাড়ানোর আগে ১৮ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া অকটেনের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়।
প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাস
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, নিয়মিত উৎস থেকে তেল আসছে। তেলের সংকট হবে না। নিয়মিত সরবরাহকারীর পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও তেল আনার প্রক্রিয়া চলছে। আশা করা যাচ্ছে, নতুন উৎস থেকেও সরবরাহ পাওয়া যাবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ
তবে জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি আবারও দেখিয়েছে যে বাংলাদেশের জ্বালানিনিরাপত্তা এখনো বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে সংঘাত বা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলেই সরবরাহব্যবস্থায় চাপ পড়ছে। অপরিশোধিত তেল নিয়ে একাধিক জাহাজ দেশে আসতে পারেনি। এতে ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল শোধনপ্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে হয়। উৎপাদন নেমে আসে তলানিতে। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে বিকল্প উৎস, বড় মজুত–সুবিধা এবং আমদানিকাঠামোয় বৈচিত্র্য আনার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব পড়ে। তাই শুধু তাৎক্ষণিকভাবে তেল আমদানি বাড়ালেই হবে না, দীর্ঘ মেয়াদে কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি, মজুত ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জ্বালানি খাতের বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা চিহ্নিত করে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে সংকট সাময়িকভাবে কমলেও স্থায়ী স্বস্তি ফিরবে না।



