জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে লঞ্চ ভাড়ায় ব্যাপক উত্থান, যাত্রীদের ক্ষোভ
দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং এর প্রভাব ইতোমধ্যে পরিবহনসহ বিভিন্ন সেক্টরে পড়তে শুরু করেছে। সরকারি কোনও সিদ্ধান্ত ছাড়াই রাজধানী থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী লঞ্চের ভাড়া একলাফে ৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন মালিকরা। এই ভাড়া বাড়ানোর ফলে যাত্রীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, যা বুধবার (২২ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা গেছে।
ভাড়া বৃদ্ধির কারণ ও যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া
লঞ্চ মালিকদের দাবি, সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে তারা বাধ্য হয়ে ভাড়া সমন্বয় করছেন। জ্বালানি খরচ তাদের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ, তাই আগের ভাড়ায় সেবা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। মালিক, কর্মচারী ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলের দাম বাড়ার আগে লঞ্চের যেসব ডেকের ভাড়া ছিল ৩০০ টাকা, সেই জায়গায় এখন ৩৫০ টাকা করে যাত্রীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে। অনেক লঞ্চে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। একইভাবে সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ছিল ১ হাজার টাকা, তা ২০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা নিচ্ছেন। ডাবল কেবিনের ভাড়া ছিল ২ হাজার টাকা, বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। এভাবে ফ্যামিলি ও সৌখিন কেবিন থেকে শুরু করে সেমি-ভিআইপি ও ভিআইপি কেবিনের ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে।
বরিশালগামী পারাবত লঞ্চের ডেকের যাত্রী কুদ্দুস মিয়া বলেন, "৩৫০ টাকা ভাড়া দিতে আমরা বাধ্য হচ্ছি। তেলের দাম বাড়ার দোহাই দিয়ে লঞ্চ মালিকরা আমাদের ওপর অতিরিক্ত ভাড়া চাপিয়ে দিচ্ছে। সরকার কিংবা রাজনৈতিক নেতা কেউই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে ভাবে না। ৩০০ টাকা ভাড়াতেও আগে মালিকদের লাভ হতো, এখন সেটা ৩৫০ টাকা। আসলে এসব অভিযোগ তুলেও লাভ নেই, কারণ ভাড়া কমানোর কার্যকর কোনও উদ্যোগ আমরা দেখি না।"
একই ধরনের কথা বলেন বিভিন্ন রুটে যাতায়াত করা ডেকের যাত্রী, রাকিব মিয়া, রহমতুল্লাহ, জব্বার মিয়াসহ একাধিক যাত্রী। তারা জানিয়েছেন, ডেকে সাধারণ লোকজন যাতায়াত করে এবং ৫০ থেকে ১০০ টাকা অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। লঞ্চের কেবিনে যাতায়াতকারী ঢাকার এক লাইব্রেরীর মালিক শিবলু রহমান আক্ষেপ করে বলেন, "সড়কপথের তুলনায় আরামদায়ক ও নিরাপদ হওয়ায় আমি নিয়মিত লঞ্চেই যাতায়াত করি। পদ্মা সেতু চালুর পর সিঙ্গেল কেবিন ১ হাজার এবং ডাবল কেবিন ২ হাজার টাকায় পাওয়া যেতো। আজ বিশেষ কাজে সপরিবারে বাড়িতে ফেরার সময় ডাবল কেবিনের ভাড়া গুণতে হয়েছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। কেন বেশি নেওয়া হচ্ছে, তা আর আলাদা করে জানতে চাইনি, কারণ তেলের দাম বাড়লে ভাড়া তো বাড়বেই। সব জিনিসের চড়া দামের মধ্যে ভাড়ার এই বাড়তি চাপ আমাদের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।"
মালিকপক্ষের ব্যাখ্যা ও সরকারি পদক্ষেপ
এ বিষয়ে এম ভি ফারহান লঞ্চের স্বত্বাধিকারী রেজাউল ইসলাম জানান, ডেকের ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ এবং কেবিনে ২০০ টাকা বাড়ানো হলেও তা পূর্বের তালিকার নিচে রয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে তারা নৌপথে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছেন। সরকারের সঙ্গে তাদের আসন্ন বৈঠকে নতুন ভাড়া নির্ধারিত হবে; যা অবশ্যই বর্তমানের এই বাড়তি ভাড়ার চেয়ে আরও বেশি হবে।
গত ১৮ এপ্রিল প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। নতুন দাম গত রবিবার থেকে কার্যকর হয়েছে এবং এই চাপ সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ছে। যাত্রীরা আশঙ্কা করছেন, সরকারি সিদ্ধান্তের আগে ভাড়া আদায়ের এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে, যা তাদের দৈনন্দিন খরচকে আরও বোঝা করে তুলবে।



